ঢাকা    সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬, ১ আষাঢ় ১৪৩৩
দৈনিক জনকথা

মৃত্যুর পর প্রায় সাত দিন ধরে একা একটি ঘরে পড়ে ছিল তাঁর মরদেহ। শিক্ষা ও পদবীর আড়ালে এক নির্মম সামাজিক প্রচ্ছন্ন হত্যা



মৃত্যুর পর প্রায় সাত দিন ধরে একা একটি ঘরে পড়ে ছিল তাঁর মরদেহ। শিক্ষা ও পদবীর আড়ালে এক নির্মম সামাজিক প্রচ্ছন্ন হত্যা

মৃত্যুর পর প্রায় সাত দিন ধরে একা একটি ঘরে পড়ে ছিল তাঁর মরদেহ। শিক্ষা ও পদবীর আড়ালে এক নির্মম সামাজিক প্রচ্ছন্ন হত্যা

ওয়াদুদ খন্দকার

দৈনিক জনকথা

ঢাকার মিরপুর-১১ নম্বরের একটি ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার হওয়া ৭৫ বছর বয়সী বৃদ্ধা নুরজাহান বেগমের পচাগলা লাশের খবরটি দেশের বিবেকবান প্রতিটি মানুষের বুকে কুঠারাঘাত করেছে। ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, মৃত্যুর পর প্রায় সাত দিন ধরে একা একটি ঘরে পড়ে ছিল তাঁর মরদেহ। গলিত সেই মরদেহে পোকা ধরেছিল। অথচ এই হতভাগ্য মায়ের সন্তানেরা সমাজের শীর্ষ স্তরের মানুষ। এক ছেলে বাংলাদেশ সরকারের যুগ্ম সচিব, আরেক ছেলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষক, আর মেয়ে ও জামাতাও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। সমাজ যাদের ‘উচ্চশিক্ষিত’, ‘সফল’ এবং ‘মর্যাদাবান’ বলে পুজো করে, আজ তাদের কদর্য রূপটি উন্মোচিত হয়েছে। 

সফলতার মঞ্চে মানবিকতার চরম পরাজয়

যে মা ১০ মাস ১০ দিন গর্ভে ধারণ করে, নিজের সব সুখ বিসর্জন দিয়ে সন্তানদের খাইয়ে-পরিয়ে বড় করেছেন, আজ তাঁর শেষ জীবনের প্রাপ্তি শুধুই অবহেলা আর তীব্র নিঃসঙ্গতা। সন্তানদের সফল ও প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে মা হয়তো নিজের জন্য কিছুই রাখেননি। অথচ, সেই সন্তানেরা যখন নিজেদের বিশাল অট্টালিকা ও ক্যারিয়ারের গোলকধাঁধায় ব্যস্ত, তখন জন্মদাত্রী মা একটি নোংরা, অগোছালো ও পরিত্যক্ত ঘরে বিনা চিকিৎসায়, হয়তো বা না খেয়ে তিলে তিলে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন। সাতটি দিন পার হয়ে গেলেও কোনো সন্তানের একটিবার ফোন করার কিংবা মায়ের গলার স্বর শোনার মতো ফুরসত হয়নি! ঈদের মতো আনন্দের দিনগুলোতেও মায়ের খবর নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি কেউ। 

এই শিক্ষা কী আমাদের অমানুষ বানাচ্ছে?

আমাদের বর্তমান সমাজব্যবস্থা শুধু ‘অর্থ ও পদবী’ অর্জনের শিক্ষাকেই আসল শিক্ষা বলে মনে করছে। নীতি-নৈতিকতা, পারিবারিক বন্ধন এবং ধর্মীয় বা মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা আজ কর্পোরেট সফলতার নিচে চাপা পড়ে গেছে। যে সন্তান মায়ের পচন ধরা লাশের খবর রাখে না, তার ডিগ্রি আর উচ্চপদের মূল্য ঠিক কতটুকু? এমন তথাকথিত শিক্ষিত মানুষদের আমরা খুব সহজে ‘অমানুষ’ বলে সংজ্ঞায়িত করতে পারি। কারণ, বনের পশুপাখিও তাদের জন্মদাত্রীকে এভাবে ফেলে রেখে যায় না। 

আজকের ব্যস্ততা, আগামীদিনের প্রতিচ্ছবি

আমাদের মনে রাখা উচিত—সময় চক্রাকার। আজ আমরা আমাদের ক্যারিয়ার, পরিবার আর আভিজাত্য নিয়ে এতটাই ব্যস্ত যে, জন্মদাতা পিতা-মাতাকে বোঝা মনে করছি। কিন্তু আমরা ভুলে যাচ্ছি, আগামীকাল আমাদের সন্তানেরাও আমাদের এই আচরণ দেখেই বড় হচ্ছে। আজ আমরা তাদের যে ‘কোল্ড-ব্লাডেড’ বা আবেগহীন সংস্কৃতি শেখাচ্ছি, আগামীকাল আমাদেরও ঠিক একই পরিণতি বরণ করতে হতে পারে। 

শেষ কথা ও একটি আকুল আহ্বান

মিরপুরের এই ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি আমাদের সামগ্রিক সমাজের এক নীরব ব্যাধি। বৃদ্ধ পিতা-মাতারা আজ নিজ ঘরেই পরবাসী। তাদের নীরব কান্না এবং দীর্ঘশ্বাস আমরা শুনতে পাই না। 

যাদের মা-বাবা আজও বেঁচে আছেন, আজই, এই মুহূর্তেই তাঁদের একটি ফোন করুন। তাঁদের পাশে গিয়ে বসুন, তাঁদের হাত দুটো জড়িয়ে ধরে বলুন—"আমি আছি"। মা-বাবা কোনো বোঝা নন, তাঁরা আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ এবং জীবনের সবচেয়ে বড় ঋণ। এই ঋণ শোধ করার সাধ্য আমাদের নেই, কিন্তু তাঁদের একটু সম্মান ও ভালোবাসা দেওয়ার ক্ষমতা নিশ্চয়ই আমাদের আছে। 

আসুন, এই পোস্টটি এবং এই বার্তাটি ছড়িয়ে দিই সবার মাঝে। আগামী প্রজন্ম যেন এই নির্মমতা থেকে শিক্ষা নেয় এবং সমাজ থেকে এই ‘শিক্ষিত অমানুষদের’ মুখোশ উন্মোচিত হয়। বৃদ্ধ বয়সে কোনো মায়ের পরিণতি যেন এমন নির্মম একাকীত্বের না হয়। 





দৈনিক জনকথা

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬


মৃত্যুর পর প্রায় সাত দিন ধরে একা একটি ঘরে পড়ে ছিল তাঁর মরদেহ। শিক্ষা ও পদবীর আড়ালে এক নির্মম সামাজিক প্রচ্ছন্ন হত্যা

প্রকাশের তারিখ : ০২ জুন ২০২৬

featured Image

মৃত্যুর পর প্রায় সাত দিন ধরে একা একটি ঘরে পড়ে ছিল তাঁর মরদেহ। শিক্ষা ও পদবীর আড়ালে এক নির্মম সামাজিক প্রচ্ছন্ন হত্যা

ওয়াদুদ খন্দকার

দৈনিক জনকথা

ঢাকার মিরপুর-১১ নম্বরের একটি ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার হওয়া ৭৫ বছর বয়সী বৃদ্ধা নুরজাহান বেগমের পচাগলা লাশের খবরটি দেশের বিবেকবান প্রতিটি মানুষের বুকে কুঠারাঘাত করেছে। ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, মৃত্যুর পর প্রায় সাত দিন ধরে একা একটি ঘরে পড়ে ছিল তাঁর মরদেহ। গলিত সেই মরদেহে পোকা ধরেছিল। অথচ এই হতভাগ্য মায়ের সন্তানেরা সমাজের শীর্ষ স্তরের মানুষ। এক ছেলে বাংলাদেশ সরকারের যুগ্ম সচিব, আরেক ছেলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষক, আর মেয়ে ও জামাতাও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। সমাজ যাদের ‘উচ্চশিক্ষিত’, ‘সফল’ এবং ‘মর্যাদাবান’ বলে পুজো করে, আজ তাদের কদর্য রূপটি উন্মোচিত হয়েছে। 

সফলতার মঞ্চে মানবিকতার চরম পরাজয়

যে মা ১০ মাস ১০ দিন গর্ভে ধারণ করে, নিজের সব সুখ বিসর্জন দিয়ে সন্তানদের খাইয়ে-পরিয়ে বড় করেছেন, আজ তাঁর শেষ জীবনের প্রাপ্তি শুধুই অবহেলা আর তীব্র নিঃসঙ্গতা। সন্তানদের সফল ও প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে মা হয়তো নিজের জন্য কিছুই রাখেননি। অথচ, সেই সন্তানেরা যখন নিজেদের বিশাল অট্টালিকা ও ক্যারিয়ারের গোলকধাঁধায় ব্যস্ত, তখন জন্মদাত্রী মা একটি নোংরা, অগোছালো ও পরিত্যক্ত ঘরে বিনা চিকিৎসায়, হয়তো বা না খেয়ে তিলে তিলে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন। সাতটি দিন পার হয়ে গেলেও কোনো সন্তানের একটিবার ফোন করার কিংবা মায়ের গলার স্বর শোনার মতো ফুরসত হয়নি! ঈদের মতো আনন্দের দিনগুলোতেও মায়ের খবর নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি কেউ। 

এই শিক্ষা কী আমাদের অমানুষ বানাচ্ছে?

আমাদের বর্তমান সমাজব্যবস্থা শুধু ‘অর্থ ও পদবী’ অর্জনের শিক্ষাকেই আসল শিক্ষা বলে মনে করছে। নীতি-নৈতিকতা, পারিবারিক বন্ধন এবং ধর্মীয় বা মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা আজ কর্পোরেট সফলতার নিচে চাপা পড়ে গেছে। যে সন্তান মায়ের পচন ধরা লাশের খবর রাখে না, তার ডিগ্রি আর উচ্চপদের মূল্য ঠিক কতটুকু? এমন তথাকথিত শিক্ষিত মানুষদের আমরা খুব সহজে ‘অমানুষ’ বলে সংজ্ঞায়িত করতে পারি। কারণ, বনের পশুপাখিও তাদের জন্মদাত্রীকে এভাবে ফেলে রেখে যায় না। 

আজকের ব্যস্ততা, আগামীদিনের প্রতিচ্ছবি

আমাদের মনে রাখা উচিত—সময় চক্রাকার। আজ আমরা আমাদের ক্যারিয়ার, পরিবার আর আভিজাত্য নিয়ে এতটাই ব্যস্ত যে, জন্মদাতা পিতা-মাতাকে বোঝা মনে করছি। কিন্তু আমরা ভুলে যাচ্ছি, আগামীকাল আমাদের সন্তানেরাও আমাদের এই আচরণ দেখেই বড় হচ্ছে। আজ আমরা তাদের যে ‘কোল্ড-ব্লাডেড’ বা আবেগহীন সংস্কৃতি শেখাচ্ছি, আগামীকাল আমাদেরও ঠিক একই পরিণতি বরণ করতে হতে পারে। 

শেষ কথা ও একটি আকুল আহ্বান

মিরপুরের এই ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি আমাদের সামগ্রিক সমাজের এক নীরব ব্যাধি। বৃদ্ধ পিতা-মাতারা আজ নিজ ঘরেই পরবাসী। তাদের নীরব কান্না এবং দীর্ঘশ্বাস আমরা শুনতে পাই না। 

যাদের মা-বাবা আজও বেঁচে আছেন, আজই, এই মুহূর্তেই তাঁদের একটি ফোন করুন। তাঁদের পাশে গিয়ে বসুন, তাঁদের হাত দুটো জড়িয়ে ধরে বলুন—"আমি আছি"। মা-বাবা কোনো বোঝা নন, তাঁরা আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ এবং জীবনের সবচেয়ে বড় ঋণ। এই ঋণ শোধ করার সাধ্য আমাদের নেই, কিন্তু তাঁদের একটু সম্মান ও ভালোবাসা দেওয়ার ক্ষমতা নিশ্চয়ই আমাদের আছে। 

আসুন, এই পোস্টটি এবং এই বার্তাটি ছড়িয়ে দিই সবার মাঝে। আগামী প্রজন্ম যেন এই নির্মমতা থেকে শিক্ষা নেয় এবং সমাজ থেকে এই ‘শিক্ষিত অমানুষদের’ মুখোশ উন্মোচিত হয়। বৃদ্ধ বয়সে কোনো মায়ের পরিণতি যেন এমন নির্মম একাকীত্বের না হয়। 






দৈনিক জনকথা

সম্পাদক ও প্রকাশক: ওয়াদুদ খন্দকার
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক জনকথা
মৃত্যুর পর প্রায় সাত দিন ধরে একা একটি ঘরে পড়ে ছিল তাঁর মরদেহ। শিক্ষা ও পদবীর আড়ালে এক নির্মম সামাজিক প্রচ্ছন্ন হত্যা
0:00 0:00
1.0x