ধেয়ে আসছে ‘এল নিনো’: বিশ্বজুড়ে মহাবিপর্যয়ের শঙ্কা জাতিসংঘের
ওয়াদুদ খন্দকার
বিশেষ প্রতিনিধি, দৈনিক জনকথা
জলবায়ু পরিবর্তনের চরম অভিঘাতে এমনিতেই বিপর্যস্ত আমাদের এই পৃথিবী। এর মধ্যেই বিশ্ববাসীর জন্য নতুন এক মহা-উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রশান্ত মহাসাগরীয় আবহাওয়াগত প্রক্রিয়া ‘এল নিনো’। সম্প্রতি জাতিসংঘের আবহাওয়া বিষয়ক সংস্থা বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO) এক ভয়ঙ্কর সতর্কবার্তা জারি করেছে। সংস্থাটির মতে, আগামী জুন থেকে আগস্টের মধ্যে ‘এল নিনো’ সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৮০ শতাংশ, যা আগামী নভেম্বর নাগাদ পূর্ণাঙ্গ রূপ নিয়ে ৯০ শতাংশেরও বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। জাতিসংঘের এই জরুরি সতর্কবার্তা বিশ্বজুড়ে তীব্র খরা, দাবানল, অতিবৃষ্টি ও চরম আবহাওয়াগত মহাবিপর্যয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
আগুনে ঘি ঢালবে এল নিনো
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এক ভিডিওবার্তায় বিশ্ববাসীকে সতর্ক করে বলেছেন, "এল নিনো পরিস্থিতি উষ্ণ হতে থাকা এই পৃথিবীর আগুনে আরও ঘি ঢালবে"। তিনি এটিকে একটি ‘জরুরি জলবায়ু সতর্কতা’ হিসেবে বিবেচনা করতে পৃথিবীর সব দেশের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিল্পায়ন ও গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের ফলে গত দেড়শ বছরে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ইতিমধ্যে প্রায় ১.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে এল নিনোর প্রভাবে ২০২৬ সালের দ্বিতীয়ার্ধ ও ২০২৭ সালে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির সব রেকর্ড ভেঙে চুরমার হয়ে যেতে পারে।
মহাবিপর্যয়ের রূপরেখা: খরা, বন্যা ও রোগব্যাধি
এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে বাতাস, বায়ুচাপ এবং বৃষ্টিপাতের ধরনে প্রলয়ঙ্কারী পরিবর্তন আসবে। এর প্রধান প্রভাবগুলো হলো:
- তীব্র খরা ও ফসলের ক্ষতি: দক্ষিণ এশিয়া (ভারত ও বাংলাদেশসহ), অস্ট্রেলিয়া, মধ্য আমেরিকা এবং ইন্দোনেশিয়ায় দেখা দিতে পারে তীব্র খরা। অপর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতের কারণে কৃষিখাতে আমন চাষসহ অন্যান্য খাদ্যশস্যের উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে, যা বিশ্বজুড়ে তীব্র খাদ্য সংকটের জন্ম দিতে পারে।
- অতিবৃষ্টি ও বন্যা: বিপরীত দিকে, দক্ষিণ আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চল, যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চল, হর্ন অব আফ্রিকা এবং মধ্য এশিয়ায় ভারী বৃষ্টিপাত এবং ভয়াবহ বন্যার ঝুঁকি তৈরি হবে।
- স্বাস্থ্য ও মহামারি ঝুঁকি: ডব্লিউএমও-র মহাসচিব সেলেস্তে সাউলো সতর্ক করেছেন যে, তীব্র তাপদাহ ও খরার পাশাপাশি মশা ও পতঙ্গবাহিত রোগ (যেমন—ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়া) এর বিস্তার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়তে পারে। একইসঙ্গে কমে যাবে সুপেয় খাদ্য ও পানির সরবরাহ।
বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার ঝুঁকি
যদিও আবহাওয়া বিজ্ঞানীদের একাংশের মতে বাংলাদেশ হয়তো এল নিনোর পূর্ণ শক্তির সরাসরি আঘাত থেকে কিছুটা রক্ষা পেতে পারে, তবে সামগ্রিক দক্ষিণ এশিয়ার আবহাওয়ায় এর পরোক্ষ প্রভাব হবে ভয়াবহ। এল নিনোর কারণে আমাদের দেশের প্রধান বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি অনাবৃষ্টি, তীব্র দাবদাহ এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার ফলে আমন ও বোরো চাষে বড় ধাক্কা লাগতে পারে। এর ফলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা এবং অর্থনীতি বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে।
এখনই চাই বৈশ্বিক ও জাতীয় প্রস্তুতি
জাতিসংঘ স্পষ্ট জানিয়েছে, দুর্যোগ আঘাত হানার পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে এখনই পূর্বপ্রস্তুতি নেওয়া জরুরি। বিপর্যয় এড়াতে জাতিসংঘ মূলত দুটি বিষয়ে জোর দিচ্ছে:
১. নবায়নযোগ্য জ্বালানি: জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দ্রুত নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে ধাবিত হওয়া।
২. আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম: দুর্যোগের আগাম তথ্য প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে 'আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম' বা প্রাথমিক সতর্কীকরণ ব্যবস্থার দ্রুত প্রসার ঘটানো।
উপসংহার
প্রকৃতির এই আসন্ন তাণ্ডব কোনো কাল্পনিক গল্প নয়, বরং বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত এক নির্মম সত্য। এল নিনোর এই মহাবিপর্যয় থেকে বাঁচতে হলে বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে এখন থেকেই দীর্ঘমেয়াদি কৃষি ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। যদি আমরা এই সতর্কবার্তাকে উপেক্ষা করি, তবে আগামী দিনগুলোতে মানবজাতিকে এক অপূরণীয় মানবিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখোমুখি হতে হবে।