দিল্লিতে নিজ ফ্ল্যাটে ডিইউ অধ্যাপিকা খুন: বন্ধ দরজার আড়ালে ঘনীভূত রহস্য
ওয়াদুদ খন্দকার, বিশেষ প্রতিনিধি, দৈনিক জনকথা:
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে নিজ ফ্ল্যাট থেকে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ডিইউ) এক সহকারী অধ্যাপিকার রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। নিহত শিক্ষিকার নাম দেবস্মিতা পাল (৪৯), যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত শিবাজি কলেজের ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপিকা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। গতকাল বৃহস্পতিবার (৪ জুন) পূর্ব দিল্লির বসুন্ধরা এনক্লেভের ‘সত্যম অ্যাপার্টমেন্ট’ থেকে তার মরদেহটি উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিক তদন্তের পর দিল্লি পুলিশ একে একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড বলে নিশ্চিত করেছে। তবে ঘর থেকে কোনো টাকা বা অলঙ্কার খোয়া না যাওয়ায় এই খুনের পেছনে গভীর কোনো ব্যক্তিগত বা অন্য কোনো রহস্য রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তালাবদ্ধ ফ্ল্যাট ও বোনের সন্দেহ
পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, বসুন্ধরা এনক্লেভের ওই ফ্ল্যাটে একাই থাকতেন দেবস্মিতা পাল। তার স্বামী কর্মসূত্রে কর্ণাটকের বেঙ্গালুরুতে বসবাস করেন। বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই দেবস্মিতার ফ্ল্যাটটি বাইরে থেকে তালাবদ্ধ ছিল। তার বড় বোন, ৪৯ বছর বয়সী দেবরতি পাল সকাল থেকে বারবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও দেবস্মিতার কোনো সাড়া পাননি। দীর্ঘ সময় কোনো খোঁজ না পেয়ে সন্দেহ ও চরম উদ্বেগ নিয়ে দুপুরে সত্যম অ্যাপার্টমেন্টে পৌঁছান দেবরতি। কোনো অঘটন ঘটেছে আশঙ্কা করে তিনি প্রতিবেশীদের সহায়তায় ফ্ল্যাটের তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন এবং বোনকে রক্তাক্ত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখেন।
ঘটনাস্থলে পুলিশ ও প্রাথমিক তদন্তের তথ্য
দুপুর ২টা ৩৫ মিনিটে নিউ অশোক নগর থানায় দেবরতি পালের ফোন পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় পুলিশের একটি বিশেষ দল এবং ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা। পুলিশ মরদেহটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য লাল বাহাদুর শাস্ত্রী (এলবিএস) হাসপাতালে পাঠায়।
প্রাথমিক সুরতহাল রিপোর্ট ও তদন্ত শেষে পুলিশ জানিয়েছে:
- মাথায় গভীর ক্ষত: দেবস্মিতার মাথায় একটি গভীর আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, কোনো ভারী বা ভোঁতা বস্তু দিয়ে অত্যন্ত নির্মমভাবে তার মাথায় আঘাত করা হয়েছে।
- আত্মরক্ষার চেষ্টা ও ক্ষতচিহ্ন: তার হাতের কব্জির শিরাগুলো কাটা বা ছিন্ন অবস্থায় পাওয়া গেছে। তদন্তকারীদের মতে, হামলাকারীর হাত থেকে বাঁচতে দেবস্মিতা লড়াই করেছিলেন এবং এগুলো মূলত আত্মরক্ষামূলক আঘাতের (Defensive Wounds) চিহ্ন।
- চুরি বা ডাকাতির উদ্দেশ্য নয়: ঘরের সমস্ত জিনিসপত্র অক্ষত ছিল। এমনকি দেবস্মিতার কানের সোনার দুলসহ কোনো মূল্যবান গয়না বা নগদ টাকা চুরি হয়নি। ফলে লুণ্ঠনের উদ্দেশ্যে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেনি বলেই নিশ্চিত পুলিশ।
খুনের নেপথ্যে কী? তদন্তে পুলিশ
দিল্লি পুলিশ ইতিমধ্যেই ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS)-এর নির্দিষ্ট ধারায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছে। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পেছনের আসল মোটিভ বা কারণ উদ্ঘাটনে এবং অপরাধীকে দ্রুত গ্রেফতার করতে পুলিশের একাধিক বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছে।
ডেপুটি কমিশনার জানিয়েছেন, তারা এলাকার সিসিটিভি (CCTV) ফুটেজ, দেবস্মিতার মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড এবং তার সাম্প্রতিক গতিবিধি খতিয়ে দেখছেন। একই সাথে তার ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনের কোনো বিরোধ এই ঘটনার পেছনে দায়ী কি না, তাও গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অত্যন্ত জনপ্রিয় ও মেধাবী অধ্যাপিকার এমন করুণ পরিণতিতে সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের মাঝে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। অপরাধীকে দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তারা।