আমাদের শিশুরা কোথায় নিরাপদ? বরুড়ার ঘটনা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা
ওয়াদুদ খন্দকার দৈনিক জনকতা
কুমিল্লার বরুড়া উপজেলায় মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে দুটি পৃথক স্থানে দুই শিশুকে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের যে পাশবিক চিত্র গণমাধ্যমে উঠে এসেছে, তা যেকোনো বিবেকবান মানুষকে স্তব্ধ করে দেয় । উত্তরশীলমুড়ি ও লক্ষিপুর ইউনিয়নে যথাক্রমে আট ও ছয় বছর বয়সী দুই নিষ্পাপ শিশু যেভাবে লালসার শিকার হয়েছে, তা কোনো সভ্য সমাজের চিত্র হতে পারে না। আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি এই সামাজিক ব্যাধি রুখতে এখন প্রয়োজন সর্বোচ্চ সামাজিক প্রতিরোধ ও পারিবারিক সচেতনতা।
১. পারিবারিক সচেতনতা ও শিশুদের মানসিক পাঠ
আমাদের অসচেতনতার সুযোগেই অপরাধীরা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। পরিবার থেকেই শিশুদের কিছু মৌলিক সুরক্ষামূলক শিক্ষা দেওয়া জরুরি:
- স্পর্শের পার্থক্য শেখানো: আপনার সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই ‘নিরাপদ স্পর্শ’ (Good Touch) এবং ‘অনিরাপদ স্পর্শ’ (Bad Touch) সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দিন।
- শরীরের গোপনীয়তা: শিশুদের বোঝাতে হবে যে তাদের শরীর সম্পূর্ণ তাদের নিজস্ব। মা-বাবা বা চিকিৎসক ছাড়া অন্য কেউ যেন তাদের শরীরে অনাকাঙ্ক্ষিত হাত দিতে না পারে।
- একাকীত্ব পরিহার: পরিচিত প্রতিবেশী কিংবা আত্মীয় হলেও শিশুদের একা বা নির্জন স্থানে পাঠাবেন না । বরুড়ার ঘটনা প্রমাণ করে, চেনা মানুষ বা স্থানীয় দোকানিরাও শিশুদের জন্য অনিরাপদ হয়ে উঠতে পারে।
২. সহপাঠী ও বন্ধুদের ভূমিকা (বরুড়ার ঘটনা থেকে শিক্ষা)
উত্তরশীলমুড়ি ইউনিয়নে আট বছরের শিশুটি যখন মুদি দোকানে নিপীড়নের শিকার হচ্ছিল, তখন দূর থেকে তার সহপাঠীরা তা দেখে ফেলে এবং অভিভাবকদের জানায়। ফলে অপরাধী ধরা পড়ে।
- শিশুদের শেখাতে হবে খেলার সাথী বা বন্ধুদের বিপদে পড়লে যেন তারা লুকিয়ে না রেখে অবিলম্বে বড়দের বা মা-বাবাকে তা জানায়।
৩. অপরাধীদের দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও সামাজিক বয়কট
আইনের ফাঁকফোকর গলে অপরাধীরা পার পেয়ে গেলে এই ধরনের ব্যাধি সমাজে মহামারী আকার ধারণ করে।
- পলাতক আসামিকে গ্রেপ্তার: লক্ষিপুর ইউনিয়নে ৬ বছরের শিশুকে নির্যাতনকারী পলাতক হারুনকে দ্রুততম সময়ে গ্রেপ্তার করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে চিরুনি অভিযান চালাতে হবে।
- আইনি দীর্ঘসূত্রতা দূর: এই ধরনের স্পর্শকাতর মামলায় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা দরকার, যেন তা দেখে অন্য কোনো অপরাধী এমন সাহস না পায়।
- সামাজিক বয়কট: লম্পট ও যৌন নিপীড়কদের সামাজিকভাবে পুরোপুরি বয়কট করতে হবে। তাদের কোনো রাজনৈতিক বা স্থানীয় আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না।
৪. স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের করণীয়
ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, মেম্বার এবং স্থানীয় যুবসমাজকে নিজ নিজ এলাকায় "শিশু সুরক্ষা সেল" বা সচেতনতা কমিটি গঠন করতে হবে। প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় অপরিচিত বা সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের গতিবিধির ওপর নজরদারি বাড়ানো আবশ্যক।
শেষ কথা
একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিশুদের নিরাপদ শৈশবের ওপর। বরুড়ার নির্যাতিত দুই শিশুর কান্না আমাদের সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের কথাই মনে করিয়ে দেয়। আসুন, আমরা প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতন হই, সন্তানদের প্রতি নজরদারি বাড়াই এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে একটি নিরাপদ সমাজ গড়ে তুলি।