বাংলাদেশে শিশু নির্যাতন রোধে জাতীয় টাস্কফোর্স গঠনের আহ্বান
ওয়াদুদ খন্দকার, ঢাকা
রাজধানীর শহীদ আবু সাঈদ কনভেনশন সেন্টারে ‘বাংলাদেশে শিশু নির্যাতন ও করণীয়’ শীর্ষক এক উচ্চপর্যায়ের গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে দেশের বিশিষ্টজনরা ক্রমবর্ধমান শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে একটি ‘জাতীয় শিশু নিরাপত্তা টাস্কফোর্স’ গঠনের জোর দাবি জানিয়েছেন। একই সাথে বক্তারা শিশুদের শারীরিক, মানসিক এবং অনলাইনভিত্তিক সুরক্ষায় পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় স্তর পর্যন্ত সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দেন।
শনিবার (৬ জুন, ২০২৬) ‘নিপীড়িত নারী ও শিশুদের আইনি ও স্বাস্থ্য সহায়তা সেল’-এর উদ্যোগে এই গুরুত্বপূর্ণ গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করা হয়। সেল-এর কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী অধ্যাপক ড. মো. রফিকুল ইসলামের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ও প্রধান বক্তা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখেন দেশের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক ও বিচারবিভাগীয় ব্যক্তিত্বরা।
রামিসা হত্যার দ্রুত বিচারের আশ্বাস
বৈঠকে সম্প্রতি পল্লবীতে নির্মমভাবে ধর্ষণের পর হত্যাকাণ্ডের শিকার ৮ বছর বয়সী শিশু রামিসার পিতা আবদুল হান্নান মোল্লা উপস্থিত হয়ে আবেগঘন বক্তব্য রাখেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি প্রশ্ন তোলেন, "এই নৃশংসতার দায় কার? সমাজ নাকি রাষ্ট্রের?" তিনি আর কোনো বাবা-মায়ের বুক খালি না হওয়ার জন্য একটি নিরাপদ সমাজব্যবস্থা এবং রামিসা হত্যার দ্রুততম সময়ে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতের দাবি জানান। উপস্থিত নীতিনির্ধারকরা তার এই আবেদনে সংহতি প্রকাশ করে বলেন, দ্রুততম সময়ের মধ্যে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের মাধ্যমে এই হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে।
উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে অনলাইন ও মানসিক নির্যাতন
গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, বর্তমান সময়ে শিশুদের প্রতি কেবল শারীরিক ও যৌন নির্যাতনই বাড়ছে না, বরং অনলাইনভিত্তিক এবং মানসিক নির্যাতনের ঝুঁকিও আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। এই আধুনিক সংকট থেকে শিশুদের বাঁচাতে কয়েকটি জরুরি করণীয় তুলে ধরা হয়:
- অভিভাবকদের সচেতনতা: ইন্টারনেটের যুগে সন্তানদের সাইবার নিরাপত্তার বিষয়ে বাবা-মাকে সচেতন হতে হবে।
- সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার: দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কার্যকর শিশু সুরক্ষা সেল গঠন করতে হবে।
- প্রযুক্তির নিরাপদ ব্যবহার: শিশুদের জন্য ডিভাইসের নিয়ন্ত্রিত ও শিক্ষণীয় ব্যবহার নিশ্চিত করা আবশ্যক।
সামাজিক ও মানবিক সহায়তার গুরুত্ব
বৈঠকে অংশ নেওয়া সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মিজ ফারজানা শারমীন এবং অন্যান্য সংসদ সদস্যরা উল্লেখ করেন, শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। নির্যাতিত নারী ও শিশুদের জন্য যারা আইনি, চিকিৎসা এবং মানসিক কাউন্সিলিং সেবা দিচ্ছে, তাদের কার্যক্রম আরও প্রত্যন্ত অঞ্চলে সম্প্রসারণ করা দরকার। এর ফলে ভুক্তভোগীরা সহজে ন্যায়বিচার পাবে এবং দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে।
গোলটেবিল বৈঠকে অন্যান্যের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য নিপুণ রায় চৌধুরী, বিশিষ্ট অভিনেতা আশরাফ উদ্দিন আহমেদ উজ্জ্বল, কালের কণ্ঠের সম্পাদক হাসান হাফিজ, বিভিন্ন মানবাধিকার ও নারী-শিশু অধিকার রক্ষা সংগঠনের প্রতিনিধি, চিকিৎসক, আইনজীবী এবং সমাজকর্মীরা। বক্তারা সবাই একমত হন যে, কেবল আইন প্রয়োগ করে শিশু নির্যাতন বন্ধ করা সম্ভব নয়; এর জন্য পরিবার, সমাজ, গণমাধ্যম এবং রাষ্ট্রকে একযোগে কাজ করতে হবে।