যমজ কন্যাসন্তান জন্ম দেওয়ায় স্ত্রীকে তালাক: আধুনিক সমাজে জাহেলিয়াতের নির্মম রূপ।
বিশেষ প্রতিবেদন
ঝিনাইদহ: বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এই চরম উৎকর্ষের যুগে দাঁড়িয়েও আমাদের সমাজ থেকে এখনো দূর হয়নি কন্যাসন্তান জন্মের প্রতি চরম সংকীর্ণতা ও কুসংস্কার। কন্যাসন্তান জন্ম দেওয়া অপরাধ—এমন এক আদিম ও অমানবিক মানসিকতার নজির মিলল ঝিনাইদহের মহেশপুরে। সেখানে গর্ভে যমজ কন্যাসন্তান থাকা এবং পরবর্তীতে তাদের জন্ম দেওয়ার অপরাধে (!) রীনা খাতুন (২২) নামের এক তরুণীকে শারীরিক-মানসিক নির্যাতন এবং শেষ পর্যন্ত তালাক দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তাঁর স্বামী রাকিবুল ইসলামের বিরুদ্ধে।
ঘটনার পটভূমি ও পারিবারিক নির্যাতন
জানা গেছে, ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার কাজীরবেড় ইউনিয়নের পুরাতন কোলা গ্রামের প্রয়াত পীর বক্সের মেয়ে রীনা খাতুনের সঙ্গে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিয়ে হয় পাশের নতুন কোলা গ্রামের শহিদুল ইসলামের ছেলে রাকিবুল ইসলামের । বিয়ের কিছুদিন পর রীনা অন্তঃসত্ত্বা হন। কিন্তু আনন্দের এই বার্তাটিই পরবর্তীতে তাঁর জীবনের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়। চিকিৎসকদের মাধ্যমে আল্ট্রাসনোগ্রাফি করে যখন জানা যায় যে রীনার গর্ভে যমজ কন্যাসন্তান রয়েছে, তখন থেকেই স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনের আচরণ বদলে যায়। কন্যাসন্তানের খবর শোনার পর থেকেই শুরু হয় যৌতুকের দাবি এবং তীব্র মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন।
বাবার বাড়ি আশ্রয় ও কন্যাসন্তানদের জন্ম
শ্বশুরবাড়ির নির্মম নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে একপর্যায়ে গর্ভবতী রীনা খাতুন তাঁর বিধবা মায়ের কাছে বাবার বাড়িতে চলে আসেন । সেখানেই প্রায় ছয় মাস আগে একটি বেসরকারি ক্লিনিকে অস্ত্রোপচারের (সিজার) মাধ্যমে দুটি ফুটফুটে যমজ কন্যাসন্তানের জন্ম দেন তিনি। কিন্তু সন্তানের মুখ দেখার পর স্বামী বা তাঁর পরিবারের কেউ তাদের খোঁজ নেওয়া তো দূরের কথা, উল্টো যমজ মেয়ে হওয়ার অজুহাতে রীনাকে চূড়ান্তভাবে তালাক দিয়ে দেয় তাঁর স্বামী।
অসহায়ত্বের আড়ালে এক মায়ের আকুল প্রশ্ন
পিতৃহীন ও সহায়-সম্বলহীন রীনা খাতুন বর্তমানে তাঁর দুই নবজাতককে নিয়ে চরম অর্থনৈতিক ও মানসিক সংকটে দিন কাটাচ্ছেন। বুকের দুধের সংকুলান না হওয়ায় দুটি বাচ্চার জন্য প্রতি মাসে প্রায় ১২ হাজার টাকার বিকল্প খাবার কিনতে হচ্ছে, যা তাঁর বিধবা মায়ের পক্ষে বহন করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
অশ্রুভেজা চোখে রীনা খাতুন প্রশ্ন তোলেন—
"কন্যাসন্তান হওয়ায় আমার কি কোনো হাত আছে? এখানে আমার কী দোষ? কন্যাসন্তান হয়েছে বলে আমাকে নির্যাতন করত, যৌতুকের জন্য চাপ দিত, একপর্যায়ে তালাক দিয়েছে।"
গ্রামের মাতবর এবং থানা-পুলিশের দোরগোড়ায় ঘুরেও কোনো সুরাহা না পেয়ে রীনা খাতুন সম্প্রতি মহেশপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর প্রতিকার ও ন্যায়বিচারের দাবিতে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
বিজ্ঞান কী বলে? দোষ আসলে কার?
চিকিৎসা বিজ্ঞান ও জেনেটিক্স স্পষ্ট ভাষায় প্রমাণ করেছে যে, কন্যাসন্তান বা পুত্রসন্তান জন্মের পেছনে মায়ের ক্রোমোজোমের কোনো ভূমিকাই নেই। মানুষের লিঙ্গ নির্ধারণে মায়ের কাছ থেকে সর্বদা 'X' ক্রোমোজোম আসে। বাবার শরীর থেকে যদি 'X' ক্রোমোজোম আসে তবে সন্তান মেয়ে হয়, আর 'Y' ক্রোমোজোম আসলে সন্তান ছেলে হয়। অর্থাৎ, সন্তান ছেলে হবে নাকি মেয়ে, তা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে বাবার ক্রোমোজোমের ওপর। অথচ আমাদের পুরুষতান্ত্রিক ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজে বিজ্ঞানের এই চিরন্তন সত্যকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বারবার নারীদেরই বলির পাঁঠা বানানো হচ্ছে।
আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা ও আইনি পদক্ষেপ
ঝিনাইদহের এই ঘটনাটি কেবল একটি একক পারিবারিক ট্র্যাজেডি নয়, এটি আমাদের সামগ্রিক সামাজিক অবক্ষয়ের একটি বড় প্রতিচ্ছবি। কন্যাশিশুদের সুরক্ষায় এবং নারীদের প্রতি এ ধরনের অমানবিক আচরণ বন্ধে প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে দ্রুত কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। যৌতুক নিরোধ আইন এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের আওতায় দোষী স্বামী ও তার পরিবারের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। একই সাথে প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে লিঙ্গ বৈষম্য দূরীকরণ ও সাধারণ বিজ্ঞান সচেতনতা বাড়াতে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা জরুরি।