ঢাকা    শনিবার, ২০ জুন ২০২৬, ৬ আষাঢ় ১৪৩৩
দৈনিক জনকথা

টোকিও শহর, কুড়ি টাকার রসুন এবং গ্যালারিতে একজন ‘মা’



টোকিও শহর, কুড়ি টাকার রসুন এবং গ্যালারিতে একজন ‘মা’

টোকিও শহর, কুড়ি টাকার রসুন এবং গ্যালারিতে একজন ‘মা’

ওয়াদুদ খন্দকার,  দৈনিক জনকথা

“মাকে টোকিও শহরটা কিনে দিতে ইচ্ছে হয়। কত খরচ পড়বে কে জানে!! জিনিসপত্রের যা দাম! এক পোয়া রসুনের দাম কুড়ি টাকা, বিশ্বাস হয়!?”

কবি ইমতিয়াজ মাহমুদের এই ফেসবুক কবিতাটি যখন আমরা পড়ি, তখন এক অদ্ভুত মধ্যবিত্ত হাহাকার আমাদের গ্রাস করে। মায়ের জন্য পৃথিবীর সব সুখ এনে দেওয়ার এক আকাশসম আকুতি, আর তার বিপরীতে পকেটের নির্মম বাস্তবতা। এক পোয়া রসুনের দামের কাছে যেখানে আমাদের টোকিও শহর কেনার স্বপ্ন থমকে যায়, সেখানে বুক চিরে শুধু একটাই প্রশ্ন জাগে—মায়ের জন্য আমরা ঠিক কতটুকু করতে পারি? 

সবাই হয়তো পারে না। কিন্তু কেউ কেউ পারেন। তারা টোকিও শহর কিনে দিতে না পারলেও মায়ের আঁচল জড়িয়ে এমন এক সম্মান এনে দেন, যা পুরো পৃথিবীকে স্তব্ধ করে দেয়। যেমনটা পেরেছেন ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের নতুন সেনসেশন, কেপ ভার্দের ৪০ বছর বয়সী কিংবদন্তি গোলরক্ষক ভোজিনহা।

বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে শক্তিশালী স্পেনের বিরুদ্ধে রীতিমতো প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন এই প্রবীণ গোলরক্ষক। একের পর এক চোখ ধাঁধানো সেভ করে ফুটবল বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন, দলকে এনে দিয়েছেন ঐতিহাসিক ১টি পয়েন্ট। কিন্তু ম্যাচ শেষে যখন পুরো দল উদযাপনে মত্ত, তখন ম্যান অব দ্য ম্যাচের পুরস্কার হাতে ভোজিনহার চোখ বেয়ে ঝরছিল জল। সেই অশ্রু আনন্দের ছিল না, ছিল এক চরম আক্ষেপের। 

ম্যাচ পরবর্তী সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, জীবনের সবচেয়ে বড় মঞ্চে তার মা গ্যালারিতে নেই। কারণ? সেই চেনা মধ্যবিত্ত সংকট। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা ফি এবং বিপুল পরিমাণ বন্ডের টাকা জোগাড় করার মতো সামর্থ্য ছিল না এই আফ্রিকান পরিবারের। মা আনা কান্দিদা এভোরা (Ana Candida Evora) তাই হাজার মাইল দূরে টেলিভিশনের পর্দায় ছেলের বীরত্ব দেখছিলেন আর বুক চাপড়ে কাঁদছিলেন। 

ভোজিনহার এই সরল স্বীকারোক্তি আর চোখের জল মুহূর্তেই নাড়া দেয় বৈশ্বিক ফুটবল অনুরাগী ও নীতি নির্ধারকদের। গল্পটি কোটি মানুষের হৃদয় স্পর্শ করার পর নড়েচড়ে বসে মার্কিন প্রশাসনও। মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্র্যাটিক নেতা হাকিম জেফরিস এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর বিশেষ হস্তক্ষেপে অতি দ্রুততার সাথে মওকুফ করা হয় সমস্ত ভিসা ফি। 

অবশেষে সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্তটি এসেছে। ভিসা জটিলতা কাটিয়ে আনা কান্দিদা এভোরা ইতিমধ্যেই মায়ামি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছেছেন। রবিবারে উরুগুয়ের বিপক্ষে কেপ ভার্দের দ্বিতীয় ম্যাচে গ্যালারিতে বসেই ছেলের জন্য চিৎকার করবেন তিনি। 

ভোজিনহা হয়তো তার মাকে আক্ষরিক অর্থে কোনো দামি শহর কিনে দিতে পারেননি। কিন্তু নিজের মেধা, সততা আর পায়ের নিচের মাটি কামড়ে পড়ে থাকার যে লড়াই তিনি দেখিয়েছেন, তার বিনিময়ে তিনি মাকে এনে দিয়েছেন বিশ্বজোড়া সম্মান। মার্কিন কংগ্রেস থেকে শুরু করে ফিফার শীর্ষ কর্মকর্তারা আজ এই মায়ের জন্য পথ তৈরি করে দিয়েছেন। 

টোকিও শহর কেনার সামর্থ্য আমাদের অধিকাংশেরই নেই। এক পোয়া রসুনের দাম বাড়লে আমাদের হিসাব মেলাতে কষ্ট হয়। কিন্তু ভোজিনহার এই গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মায়ের প্রতি নিখাদ ভালোবাসা আর নিজের স্বপ্নের প্রতি শতভাগ সততা থাকলে, ভাগ্যদেবতাও একদিন বাধ্য হন মায়ের মুখে চওড়া হাসি ফুটিয়ে তুলতে। গ্যালারিতে যখন আনা কান্দিদা এভোরা হাততালি দেবেন, তখন জয় হবে আসলে পৃথিবীর সমস্ত লড়াকু মায়ের।



দৈনিক জনকথা

শনিবার, ২০ জুন ২০২৬


টোকিও শহর, কুড়ি টাকার রসুন এবং গ্যালারিতে একজন ‘মা’

প্রকাশের তারিখ : ২০ জুন ২০২৬

featured Image

টোকিও শহর, কুড়ি টাকার রসুন এবং গ্যালারিতে একজন ‘মা’

ওয়াদুদ খন্দকার,  দৈনিক জনকথা

“মাকে টোকিও শহরটা কিনে দিতে ইচ্ছে হয়। কত খরচ পড়বে কে জানে!! জিনিসপত্রের যা দাম! এক পোয়া রসুনের দাম কুড়ি টাকা, বিশ্বাস হয়!?”

কবি ইমতিয়াজ মাহমুদের এই ফেসবুক কবিতাটি যখন আমরা পড়ি, তখন এক অদ্ভুত মধ্যবিত্ত হাহাকার আমাদের গ্রাস করে। মায়ের জন্য পৃথিবীর সব সুখ এনে দেওয়ার এক আকাশসম আকুতি, আর তার বিপরীতে পকেটের নির্মম বাস্তবতা। এক পোয়া রসুনের দামের কাছে যেখানে আমাদের টোকিও শহর কেনার স্বপ্ন থমকে যায়, সেখানে বুক চিরে শুধু একটাই প্রশ্ন জাগে—মায়ের জন্য আমরা ঠিক কতটুকু করতে পারি? 

সবাই হয়তো পারে না। কিন্তু কেউ কেউ পারেন। তারা টোকিও শহর কিনে দিতে না পারলেও মায়ের আঁচল জড়িয়ে এমন এক সম্মান এনে দেন, যা পুরো পৃথিবীকে স্তব্ধ করে দেয়। যেমনটা পেরেছেন ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের নতুন সেনসেশন, কেপ ভার্দের ৪০ বছর বয়সী কিংবদন্তি গোলরক্ষক ভোজিনহা।

বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে শক্তিশালী স্পেনের বিরুদ্ধে রীতিমতো প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন এই প্রবীণ গোলরক্ষক। একের পর এক চোখ ধাঁধানো সেভ করে ফুটবল বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন, দলকে এনে দিয়েছেন ঐতিহাসিক ১টি পয়েন্ট। কিন্তু ম্যাচ শেষে যখন পুরো দল উদযাপনে মত্ত, তখন ম্যান অব দ্য ম্যাচের পুরস্কার হাতে ভোজিনহার চোখ বেয়ে ঝরছিল জল। সেই অশ্রু আনন্দের ছিল না, ছিল এক চরম আক্ষেপের। 

ম্যাচ পরবর্তী সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, জীবনের সবচেয়ে বড় মঞ্চে তার মা গ্যালারিতে নেই। কারণ? সেই চেনা মধ্যবিত্ত সংকট। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা ফি এবং বিপুল পরিমাণ বন্ডের টাকা জোগাড় করার মতো সামর্থ্য ছিল না এই আফ্রিকান পরিবারের। মা আনা কান্দিদা এভোরা (Ana Candida Evora) তাই হাজার মাইল দূরে টেলিভিশনের পর্দায় ছেলের বীরত্ব দেখছিলেন আর বুক চাপড়ে কাঁদছিলেন। 

ভোজিনহার এই সরল স্বীকারোক্তি আর চোখের জল মুহূর্তেই নাড়া দেয় বৈশ্বিক ফুটবল অনুরাগী ও নীতি নির্ধারকদের। গল্পটি কোটি মানুষের হৃদয় স্পর্শ করার পর নড়েচড়ে বসে মার্কিন প্রশাসনও। মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্র্যাটিক নেতা হাকিম জেফরিস এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর বিশেষ হস্তক্ষেপে অতি দ্রুততার সাথে মওকুফ করা হয় সমস্ত ভিসা ফি। 

অবশেষে সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্তটি এসেছে। ভিসা জটিলতা কাটিয়ে আনা কান্দিদা এভোরা ইতিমধ্যেই মায়ামি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছেছেন। রবিবারে উরুগুয়ের বিপক্ষে কেপ ভার্দের দ্বিতীয় ম্যাচে গ্যালারিতে বসেই ছেলের জন্য চিৎকার করবেন তিনি। 

ভোজিনহা হয়তো তার মাকে আক্ষরিক অর্থে কোনো দামি শহর কিনে দিতে পারেননি। কিন্তু নিজের মেধা, সততা আর পায়ের নিচের মাটি কামড়ে পড়ে থাকার যে লড়াই তিনি দেখিয়েছেন, তার বিনিময়ে তিনি মাকে এনে দিয়েছেন বিশ্বজোড়া সম্মান। মার্কিন কংগ্রেস থেকে শুরু করে ফিফার শীর্ষ কর্মকর্তারা আজ এই মায়ের জন্য পথ তৈরি করে দিয়েছেন। 

টোকিও শহর কেনার সামর্থ্য আমাদের অধিকাংশেরই নেই। এক পোয়া রসুনের দাম বাড়লে আমাদের হিসাব মেলাতে কষ্ট হয়। কিন্তু ভোজিনহার এই গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মায়ের প্রতি নিখাদ ভালোবাসা আর নিজের স্বপ্নের প্রতি শতভাগ সততা থাকলে, ভাগ্যদেবতাও একদিন বাধ্য হন মায়ের মুখে চওড়া হাসি ফুটিয়ে তুলতে। গ্যালারিতে যখন আনা কান্দিদা এভোরা হাততালি দেবেন, তখন জয় হবে আসলে পৃথিবীর সমস্ত লড়াকু মায়ের।




দৈনিক জনকথা

সম্পাদক ও প্রকাশক: ওয়াদুদ খন্দকার
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক জনকথা
টোকিও শহর, কুড়ি টাকার রসুন এবং গ্যালারিতে একজন ‘মা’
0:00 0:00
1.0x