ব্যাংক থেকে টাকা উঠিয়ে ফেরা হলো না বাড়ি, ট্রাকের ধাক্কায় প্রাণ গেল প্রবাসীর
নিজস্ব প্রতিবেদক:
বছরের পর বছর দূর পরবাসে অক্লান্ত পরিশ্রম। উদ্দেশ্য একটাই—পরিবারের মুখে হাসি ফোটানো এবং দেশের মাটিতে একটু সুখে শান্তিতে থাকা। সেই স্বপ্ন নিয়ে সম্প্রতি ছুটিতে দেশে ফিরেছিলেন প্রবাসী কামরুজ্জামান (৪৫)। কিন্তু একটি নির্মম সড়ক দুর্ঘটনা তার সব স্বপ্ন আর মাটির টানে ঘরে ফেরার আনন্দকে মুহূর্তেই বিষাদে রূপ দিল। ব্যাংক থেকে টাকা তুলে বাড়ি ফেরার পথে বেপরোয়া এক ট্রাক্টরের ধাক্কায় প্রাণ হারাতে হলো তাকে।
মঙ্গলবার (২৩ জুন, ২০২৬) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ঝিনাইদহ সদর উপজেলার কালীচরণপুর ইউনিয়নের বয়ড়াতলা বাজারে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি ঘটে। নিহত কামরুজ্জামান সদর উপজেলার পাকা গ্রামের আনসার বিশ্বাসের ছেলে।
ঘটনার বিবরণ:
স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, কামরুজ্জামান দীর্ঘদিন প্রবাসে কাটিয়ে সম্প্রতি ছুটিতে দেশে আসেন। ঘটনার দিন সকালে তিনি পারিবারিক প্রয়োজনে ঝিনাইদহ শহরের একটি ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে যান। টাকা উত্তোলন শেষে একটি ইজিবাইকে চড়ে তিনি নিজ গ্রামের বাড়িতে ফিরছিলেন।
পথিমধ্যে ইজিবাইকটি বয়ড়াতলা বাজারে পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি দ্রুতগতির মাটি বোঝাই ট্রাক্টর ইজিবাইকটিকে সজোরে ধাক্কা দেয়। ট্রাক্টরের ধাক্কায় ইজিবাইকটি দুমড়ে-মুচড়ে যায় এবং কামরুজ্জামানসহ অপর এক যাত্রী গুরুতর আহত হন।
উদ্ধার ও চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু:
দুর্ঘটনার পর পরই বাজারের আশপাশের লোকজন ছুটে এসে আহতদের উদ্ধার করেন। তাদের আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন কামরুজ্জামান। এই ঘটনায় আহত অপর যাত্রীকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
পরিবারে স্তব্ধতা ও শোকের ছায়া:
কামরুজ্জামানের আকস্মিক মৃত্যুর খবরে তার পরিবার ও পাকা গ্রামে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। যে মানুষটি কয়েকদিন আগেও প্রবাসের মাটি থেকে সুস্থ শরীরে আপনজনদের বুকে ফিরেছিলেন, আজ তার এমন অকাল মৃত্যু কেউ মেনে নিতে পারছেন না। কামরুজ্জামানের উপার্জিত টাকা দিয়ে যেখানে পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়ার কথা ছিল, সেখানে এখন কেবলই কান্নার রোল আর শূন্যতা।
স্থানীয়দের ক্ষোভ:
এই দুর্ঘটনার পর স্থানীয় সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, গ্রামীণ ও আঞ্চলিক সড়কগুলোতে বেপরোয়া গতিতে মাটি ও বালু বোঝাই ট্রাক বা ট্রাক্টর চলাচলের কারণেই প্রতিনিয়ত এমন দুর্ঘটনা ঘটছে। লাইসেন্সবিহীন চালক ও ফিটনেসবিহীন এসব যানবাহনের বিরুদ্ধে প্রশাসনের কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলে দাবি করেন তারা।
ঝিনাইদহ সদর থানা পুলিশ জানায়, দুর্ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। ঘাতক যানটি আটক করার চেষ্টা চলছে এবং এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
পরবাসের ক্লান্তি ভুলে বুক ভরা আশা নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন কামরুজ্জামান। কিন্তু গ্রামীণ সড়কের বেপরোয়া যান আর অব্যবস্থাপনা তার জীবনের চাকা চিরতরে থামিয়ে দিল। ব্যাংক থেকে তোলা টাকাগুলো অক্ষত থাকলেও, তা খরচ করার মানুষটি আজ আর বেঁচে নেই।