ঢাকা    শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬, ১২ আষাঢ় ১৪৩৩
দৈনিক জনকথা

মাছির যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ গ্রামবাসী, আদালতে যাওয়ার হুঁশিয়ারি!



মাছির যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ গ্রামবাসী, আদালতে যাওয়ার হুঁশিয়ারি!

মাছির যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ গ্রামবাসী, আদালতে যাওয়ার হুঁশিয়ারি!

নিজস্ব প্রতিবেদক, গোদাগাড়ী:
মনে হচ্ছে গ্রামে এখন মানুষ নয়, মাছিরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ! রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার দেওপাড়া ইউনিয়নের ঈশ্বরীপুর গ্রামে এখন সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম—‘মাছি’. লোকালয়ের ভেতরে গড়ে ওঠা একটি লেয়ার মুরগির খামারের চরম অব্যবস্থাপনা, তীব্র দুর্গন্ধ আর লাখ লাখ মাছির উপদ্রবে গ্রামটির অন্তত ১২০টি পরিবারের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা কার্যত অচল হয়ে পড়েছে. দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরে অভিযোগ জানিয়েও কোনো স্থায়ী প্রতিকার না পেয়ে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী এবার আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি দিয়েছেন.

ঘরে-বাইরে মাছির রাজত্ব: বন্ধ আত্মীয়দের আনাগোনা

ঈশ্বরীপুর গ্রামের বাসিন্দাদের অভিযোগ, ঘর থেকে বের হওয়া তো দূরের কথা, ঘরের ভেতরে শান্তিতে দু’মুঠো ভাত খাওয়ার জো-ও আর নেই. খাবার টেবিলে বসার আগেই শত শত মাছি ভাতের থালায় ঝাঁপিয়ে পড়ছে. রান্নাবান্না করার সময়ও কড়াই কিংবা তরকারিতে মাছি ঢুকে যাচ্ছে. পরিস্থিতি এমন মারাত্মক রূপ নিয়েছে যে, মাছির ঘেন্না আর অস্বস্তির কারণে গত ছয় মাস ধরে এই গ্রামে কোনো আত্মীয়স্বজন আসতে চাচ্ছেন না. এমনকি মাছির যন্ত্রণায় মেয়ে-জামাইরাও শ্বশুরবাড়িতে আসা বন্ধ করে দিয়েছেন.

সম্প্রতি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে মা হওয়া এক গৃহিণী জানান, সদ্যজাত শিশুটিকে নিয়ে তিনি ২৪ ঘণ্টা আতঙ্কে থাকেন. যেকোনো সময় মাছিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি হয়েছে পুরো এলাকায়. শুধু মানুষই নয়, তীব্র দুর্গন্ধ আর মাছির কামড়ে গবাদিপশুদেরও ঠিকমতো খাবার খাওয়ানো যাচ্ছে না.

নেপথ্যে খামারের অব্যবস্থাপনা ও বর্জ্য দূষণ

স্থানীয়দের আঙুল মোহাম্মদ স্বপন নামের এক প্রভাবশালী ব্যক্তির মালিকানাধীন মুরগির খামারটির দিকে. অভিযোগ রয়েছে, খামারের ভেতরে সপ্তাহের পর সপ্তাহ মুরগির বিষ্ঠা ও বর্জ্য জমিয়ে রাখা হচ্ছে. বর্জ্য দূরীকরণে কোনো আধুনিক বা বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থা যেমন নেই, তেমনি খামারে নিয়মিত ব্যবহার করা হচ্ছে না কোনো দুর্গন্ধনাশক বা মাছি তাড়ানোর রাসায়নিক উপাদান. ফলে বিষ্ঠা পচে বাতাসের সাথে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে এবং মাছি বংশবৃদ্ধি করে পুরো গ্রাম ছেয়ে ফেলেছে. পূর্বে এই খামারে সোনালি জাতের মুরগি পালনের সময় পরিস্থিতি কিছুটা সহনীয় থাকলেও, বর্তমানে লেয়ার জাতের মুরগি আসার পর থেকে এই ভোগান্তি নরকযন্ত্রণায় রূপ নিয়েছে.

তদন্তে সত্যতা মিললেও মেলেনি সমাধান

পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে গ্রামবাসী জেলা প্রশাসক (ডিসি), উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে একাধিকবার লিখিত ও মৌখিক আবেদন জানান. অভিযোগের পর প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতিনিধি দল সরেজমিনে এলাকা পরিদর্শনও করেন.

গোদাগাড়ী উপজেলা প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদনেও অভিযোগের শতভাগ সত্যতা পাওয়া গেছে. তদন্ত রিপোর্টে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয় যে, খামারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় গুরুতর ত্রুটি রয়েছে এবং এটি স্থানীয় পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকি. পরিবেশ অধিদপ্তরের রাজশাহী কার্যালয়ের উপপরিচালক মোছা. তাছমিনা খাতুন জানান, খামারটির পরিবেশগত অনুমোদন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা যাচাই করে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ও বিধিমালা লঙ্ঘনের প্রমাণ মিলেছে এবং চলতি সপ্তাহের মধ্যেই খামার মালিকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে.

শেষ ভরসা আদালত, গ্রাম ছাড়ার উপক্রম

এদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও দৃশ্যমান কোনো স্থায়ী সমাধান না আসায় ক্ষোভ কমেনি এলাকাবাসীর. লোকদেখানো কোনো অভিযান বা জরিমানা নয়, বরং লোকালয় থেকে এই বর্জ্যের স্থায়ী অপসারণ চান তারা.

ভুক্তভোগী গ্রামবাসীরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, "যদি দ্রুত এই খামারের মাছি ও দুর্গন্ধের অত্যাচার বন্ধ করা না হয়, তবে নিজেদের অধিকার ও জনস্বাস্থ্য রক্ষায় আমরা মহামান্য আদালতের দ্বারস্থ হতে বাধ্য হব." পরিস্থিতি যদি এভাবে চলতে থাকে, তবে একসময়ের শান্ত এই ঈশ্বরীপুর গ্রাম অচিরেই বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে এবং গ্রামবাসীকে বাধ্য হয়ে নিজেদের ভিটেমাটি ছাড়তে হবে।


দৈনিক জনকথা

শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬


মাছির যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ গ্রামবাসী, আদালতে যাওয়ার হুঁশিয়ারি!

প্রকাশের তারিখ : ২৬ জুন ২০২৬

featured Image

মাছির যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ গ্রামবাসী, আদালতে যাওয়ার হুঁশিয়ারি!

নিজস্ব প্রতিবেদক, গোদাগাড়ী:
মনে হচ্ছে গ্রামে এখন মানুষ নয়, মাছিরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ! রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার দেওপাড়া ইউনিয়নের ঈশ্বরীপুর গ্রামে এখন সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম—‘মাছি’. লোকালয়ের ভেতরে গড়ে ওঠা একটি লেয়ার মুরগির খামারের চরম অব্যবস্থাপনা, তীব্র দুর্গন্ধ আর লাখ লাখ মাছির উপদ্রবে গ্রামটির অন্তত ১২০টি পরিবারের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা কার্যত অচল হয়ে পড়েছে. দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরে অভিযোগ জানিয়েও কোনো স্থায়ী প্রতিকার না পেয়ে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী এবার আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি দিয়েছেন.

ঘরে-বাইরে মাছির রাজত্ব: বন্ধ আত্মীয়দের আনাগোনা

ঈশ্বরীপুর গ্রামের বাসিন্দাদের অভিযোগ, ঘর থেকে বের হওয়া তো দূরের কথা, ঘরের ভেতরে শান্তিতে দু’মুঠো ভাত খাওয়ার জো-ও আর নেই. খাবার টেবিলে বসার আগেই শত শত মাছি ভাতের থালায় ঝাঁপিয়ে পড়ছে. রান্নাবান্না করার সময়ও কড়াই কিংবা তরকারিতে মাছি ঢুকে যাচ্ছে. পরিস্থিতি এমন মারাত্মক রূপ নিয়েছে যে, মাছির ঘেন্না আর অস্বস্তির কারণে গত ছয় মাস ধরে এই গ্রামে কোনো আত্মীয়স্বজন আসতে চাচ্ছেন না. এমনকি মাছির যন্ত্রণায় মেয়ে-জামাইরাও শ্বশুরবাড়িতে আসা বন্ধ করে দিয়েছেন.

সম্প্রতি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে মা হওয়া এক গৃহিণী জানান, সদ্যজাত শিশুটিকে নিয়ে তিনি ২৪ ঘণ্টা আতঙ্কে থাকেন. যেকোনো সময় মাছিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি হয়েছে পুরো এলাকায়. শুধু মানুষই নয়, তীব্র দুর্গন্ধ আর মাছির কামড়ে গবাদিপশুদেরও ঠিকমতো খাবার খাওয়ানো যাচ্ছে না.

নেপথ্যে খামারের অব্যবস্থাপনা ও বর্জ্য দূষণ

স্থানীয়দের আঙুল মোহাম্মদ স্বপন নামের এক প্রভাবশালী ব্যক্তির মালিকানাধীন মুরগির খামারটির দিকে. অভিযোগ রয়েছে, খামারের ভেতরে সপ্তাহের পর সপ্তাহ মুরগির বিষ্ঠা ও বর্জ্য জমিয়ে রাখা হচ্ছে. বর্জ্য দূরীকরণে কোনো আধুনিক বা বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থা যেমন নেই, তেমনি খামারে নিয়মিত ব্যবহার করা হচ্ছে না কোনো দুর্গন্ধনাশক বা মাছি তাড়ানোর রাসায়নিক উপাদান. ফলে বিষ্ঠা পচে বাতাসের সাথে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে এবং মাছি বংশবৃদ্ধি করে পুরো গ্রাম ছেয়ে ফেলেছে. পূর্বে এই খামারে সোনালি জাতের মুরগি পালনের সময় পরিস্থিতি কিছুটা সহনীয় থাকলেও, বর্তমানে লেয়ার জাতের মুরগি আসার পর থেকে এই ভোগান্তি নরকযন্ত্রণায় রূপ নিয়েছে.

তদন্তে সত্যতা মিললেও মেলেনি সমাধান

পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে গ্রামবাসী জেলা প্রশাসক (ডিসি), উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে একাধিকবার লিখিত ও মৌখিক আবেদন জানান. অভিযোগের পর প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতিনিধি দল সরেজমিনে এলাকা পরিদর্শনও করেন.

গোদাগাড়ী উপজেলা প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদনেও অভিযোগের শতভাগ সত্যতা পাওয়া গেছে. তদন্ত রিপোর্টে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয় যে, খামারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় গুরুতর ত্রুটি রয়েছে এবং এটি স্থানীয় পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকি. পরিবেশ অধিদপ্তরের রাজশাহী কার্যালয়ের উপপরিচালক মোছা. তাছমিনা খাতুন জানান, খামারটির পরিবেশগত অনুমোদন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা যাচাই করে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ও বিধিমালা লঙ্ঘনের প্রমাণ মিলেছে এবং চলতি সপ্তাহের মধ্যেই খামার মালিকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে.

শেষ ভরসা আদালত, গ্রাম ছাড়ার উপক্রম

এদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও দৃশ্যমান কোনো স্থায়ী সমাধান না আসায় ক্ষোভ কমেনি এলাকাবাসীর. লোকদেখানো কোনো অভিযান বা জরিমানা নয়, বরং লোকালয় থেকে এই বর্জ্যের স্থায়ী অপসারণ চান তারা.

ভুক্তভোগী গ্রামবাসীরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, "যদি দ্রুত এই খামারের মাছি ও দুর্গন্ধের অত্যাচার বন্ধ করা না হয়, তবে নিজেদের অধিকার ও জনস্বাস্থ্য রক্ষায় আমরা মহামান্য আদালতের দ্বারস্থ হতে বাধ্য হব." পরিস্থিতি যদি এভাবে চলতে থাকে, তবে একসময়ের শান্ত এই ঈশ্বরীপুর গ্রাম অচিরেই বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে এবং গ্রামবাসীকে বাধ্য হয়ে নিজেদের ভিটেমাটি ছাড়তে হবে।



দৈনিক জনকথা

সম্পাদক ও প্রকাশক: ওয়াদুদ খন্দকার
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক জনকথা
মাছির যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ গ্রামবাসী, আদালতে যাওয়ার হুঁশিয়ারি!
0:00 0:00
1.0x