ঢাকা    মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬, ১৬ আষাঢ় ১৪৩৩
দৈনিক জনকথা

মাদকের ভয়াল গ্রাস: অপরাধের বিস্ফোরণ ও বিপন্ন আগামী প্রজন্ম ওয়াদুদ খন্দকার, দৈনিক জনকথা



মাদকের ভয়াল গ্রাস: অপরাধের বিস্ফোরণ ও বিপন্ন আগামী প্রজন্ম    ওয়াদুদ খন্দকার,  দৈনিক জনকথা

মাদকের ভয়াল গ্রাস: অপরাধের বিস্ফোরণ ও বিপন্ন আগামী প্রজন্ম 

 ওয়াদুদ খন্দকার,  দৈনিক জনকথা

একটি শান্ত ও নিরাপদ সমাজ বিনির্মাণের প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে মাদকের অবাধ বিস্তার। বর্তমানে বাংলাদেশে সংঘটিত সিংহভাগ ভয়ঙ্কর ও নৃশংস অপরাধের নেপথ্যে কোনো না কোনোভাবে মাদক জড়িত। মাদক শুধু একজন ব্যক্তির জীবনীশক্তিকেই কেড়ে নিচ্ছে না, বরং পুরো সমাজব্যবস্থাকে এক চরম নৈরাজ্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক গবেষণায় দেখা গেছে দেশে প্রায় ৮২ লাখ মানুষ কোনো না কোনোভাবে অবৈধ মাদকে আসক্ত, যার একটি বড় অংশই তরুণ সমাজ। এই ভয়াল ছোবল এখনই রুখে দেওয়া না গেলে আমাদের আগামী প্রজন্ম পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে।অপরাধের কেন্দ্রবিন্দুতে মাদকসাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া চুরি, ছিনতাই, খুন ও ধর্ষণের মতো ভয়ঙ্কর অপরাধগুলোর নেপথ্য কারণ বিশ্লেষণ করলে মাদকের ভয়াবহ চিত্রটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।পারিবারিক সহিংসতা ও খুন: মাদকের টাকার জন্য নিজের জন্মদাতা পিতা-মাতা, স্ত্রী কিংবা সন্তানকে হত্যার মতো লোমহর্ষক ঘটনা এখন প্রায়ই গণমাধ্যমে আসছে।ছিনতাই ও কিশোর গ্যাং: পাড়া-মহল্লায় গড়ে ওঠা 'কিশোর গ্যাং' বা তরুণ অপরাধী চক্রগুলোর মূল চালিকাশক্তি হলো মাদক। মাদকের টাকা জোগাড় করতেই এরা জড়িয়ে পড়ছে চুরি, ছিনতাই এবং অস্ত্রবাজির মতো ভয়ঙ্কর অপরাধে।নৈতিক স্খলন ও নৃশংসতা: মাদক মানুষের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রকে বিকল করে দেয়, যার ফলে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে মানুষ চরম নৃশংস অপরাধ করতে দ্বিধাবোধ করে না।ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কেন চরম ঝুঁকিতে?তরুণ ও যুবসমাজ একটি দেশের মেরুদণ্ড। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে, মাদক কারবারিদের প্রধান লক্ষ্যই এখন দেশের এই উদীয়মান শক্তি।মেধাশূন্যতার আশঙ্কা: ইয়াবা, আইস, এলএসডি, ট্যাপেন্টাডল বা ক্ষতিকারক নিষিদ্ধ 'নেশা সিরাপ'-এর মতো ভয়ঙ্কর মাদকগুলো তরুণেরা দ্রুত গ্রহণ করায় তাদের স্মৃতিশক্তি, বুদ্ধিমত্তা ও কর্মক্ষমতা হারাচ্ছে।অরক্ষিত সীমান্ত ও সহজলভ্যতা: দেশের অরক্ষিত সীমান্ত ও বিভিন্ন চোরাচালান রুট ব্যবহার করে প্রতিদিন দেশে ঢুকছে মাদকের নতুন নতুন চালান। এই সহজলভ্যতার কারণে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীরাও খুব সহজে মাদকের ফাঁদে পা দিচ্ছে।পরিবারের বিপর্যয়: একজন সন্তান মাদকাসক্ত হওয়া মানে পুরো পরিবারের মানসিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তি ভেঙে পড়া। এভাবে ক্রমান্বয়ে পুরো জাতি একটি হতাশাজনক এবং মেধাশূন্য ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হচ্ছে।প্রতিরোধে করণীয়: কোন পথে মুক্তি?মাদকের এই মরণকামড় থেকে দেশকে বাঁচাতে হলে কেবল সরকারি অভিযানের ওপর নির্ভর করলে চলবে না, প্রয়োজন সমন্বিত সামাজিক আন্দোলন।১. সীমান্তে কঠোর নজরদারি: মাদক প্রবেশের যেসমস্ত রুট বা পয়েন্ট রয়েছে, সেগুলোতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি দ্বিগুণ করতে হবে এবং মাদক সিন্ডিকেটগুলোর বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা (Zero Tolerance) নীতি বজায় রাখতে হবে।২. পারিবারিক সচেতনতা ও নজরদারি: পরিবারই মাদক প্রতিরোধের সবচেয়ে বড় দুর্গ। সন্তানদের আচরণে কোনো পরিবর্তন আসছে কি না, তারা কাদের সাথে মিশছে—সে বিষয়ে বাবা-মাকে সচেতন থাকতে হবে।৩. সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশ: তরুণ প্রজন্মকে মাদক থেকে দূরে রাখতে মাঠ পর্যায়ে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং সামাজিক ও নৈতিক শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে।৪. চিকিৎসা ও পুনর্বাসন: যারা ইতিমধ্যে আক্রান্ত হয়েছে, তাদের সমাজ থেকে দূরে না ঠেলে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। এই লক্ষ্যে দেশের বিভাগীয় শহরগুলোতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে নিরাময় কেন্দ্রগুলোর পরিধি আরও বাড়াতে হবে।উপসংহারমাদকের বিস্তার কেবল কোনো একক ব্যক্তির সমস্যা নয়, এটি একটি জাতীয় সংকট। আগামী প্রজন্মকে যদি আমরা একটি সুস্থ, নিরাপদ এবং সমৃদ্ধ বাংলাদেশ উপহার দিতে চাই, তবে আজই মাদককে 'না' বলতে হবে। দলমত-নির্বিশেষে রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারকে একযোগে এই সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই আমাদের জাগ্রত হতে হবে, অন্যথায় আগামী দিনের নেতৃত্ব দেওয়ার মতো কোনো সুস্থ প্রজন্ম আমরা খুঁজে পাব না।

দৈনিক জনকথা

মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬


মাদকের ভয়াল গ্রাস: অপরাধের বিস্ফোরণ ও বিপন্ন আগামী প্রজন্ম ওয়াদুদ খন্দকার, দৈনিক জনকথা

প্রকাশের তারিখ : ২৯ জুন ২০২৬

featured Image

মাদকের ভয়াল গ্রাস: অপরাধের বিস্ফোরণ ও বিপন্ন আগামী প্রজন্ম 

 ওয়াদুদ খন্দকার,  দৈনিক জনকথা


একটি শান্ত ও নিরাপদ সমাজ বিনির্মাণের প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে মাদকের অবাধ বিস্তার। বর্তমানে বাংলাদেশে সংঘটিত সিংহভাগ ভয়ঙ্কর ও নৃশংস অপরাধের নেপথ্যে কোনো না কোনোভাবে মাদক জড়িত। মাদক শুধু একজন ব্যক্তির জীবনীশক্তিকেই কেড়ে নিচ্ছে না, বরং পুরো সমাজব্যবস্থাকে এক চরম নৈরাজ্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক গবেষণায় দেখা গেছে দেশে প্রায় ৮২ লাখ মানুষ কোনো না কোনোভাবে অবৈধ মাদকে আসক্ত, যার একটি বড় অংশই তরুণ সমাজ। এই ভয়াল ছোবল এখনই রুখে দেওয়া না গেলে আমাদের আগামী প্রজন্ম পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে।অপরাধের কেন্দ্রবিন্দুতে মাদকসাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া চুরি, ছিনতাই, খুন ও ধর্ষণের মতো ভয়ঙ্কর অপরাধগুলোর নেপথ্য কারণ বিশ্লেষণ করলে মাদকের ভয়াবহ চিত্রটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।পারিবারিক সহিংসতা ও খুন: মাদকের টাকার জন্য নিজের জন্মদাতা পিতা-মাতা, স্ত্রী কিংবা সন্তানকে হত্যার মতো লোমহর্ষক ঘটনা এখন প্রায়ই গণমাধ্যমে আসছে।ছিনতাই ও কিশোর গ্যাং: পাড়া-মহল্লায় গড়ে ওঠা 'কিশোর গ্যাং' বা তরুণ অপরাধী চক্রগুলোর মূল চালিকাশক্তি হলো মাদক। মাদকের টাকা জোগাড় করতেই এরা জড়িয়ে পড়ছে চুরি, ছিনতাই এবং অস্ত্রবাজির মতো ভয়ঙ্কর অপরাধে।নৈতিক স্খলন ও নৃশংসতা: মাদক মানুষের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রকে বিকল করে দেয়, যার ফলে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে মানুষ চরম নৃশংস অপরাধ করতে দ্বিধাবোধ করে না।ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কেন চরম ঝুঁকিতে?তরুণ ও যুবসমাজ একটি দেশের মেরুদণ্ড। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে, মাদক কারবারিদের প্রধান লক্ষ্যই এখন দেশের এই উদীয়মান শক্তি।মেধাশূন্যতার আশঙ্কা: ইয়াবা, আইস, এলএসডি, ট্যাপেন্টাডল বা ক্ষতিকারক নিষিদ্ধ 'নেশা সিরাপ'-এর মতো ভয়ঙ্কর মাদকগুলো তরুণেরা দ্রুত গ্রহণ করায় তাদের স্মৃতিশক্তি, বুদ্ধিমত্তা ও কর্মক্ষমতা হারাচ্ছে।অরক্ষিত সীমান্ত ও সহজলভ্যতা: দেশের অরক্ষিত সীমান্ত ও বিভিন্ন চোরাচালান রুট ব্যবহার করে প্রতিদিন দেশে ঢুকছে মাদকের নতুন নতুন চালান। এই সহজলভ্যতার কারণে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীরাও খুব সহজে মাদকের ফাঁদে পা দিচ্ছে।পরিবারের বিপর্যয়: একজন সন্তান মাদকাসক্ত হওয়া মানে পুরো পরিবারের মানসিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তি ভেঙে পড়া। এভাবে ক্রমান্বয়ে পুরো জাতি একটি হতাশাজনক এবং মেধাশূন্য ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হচ্ছে।প্রতিরোধে করণীয়: কোন পথে মুক্তি?মাদকের এই মরণকামড় থেকে দেশকে বাঁচাতে হলে কেবল সরকারি অভিযানের ওপর নির্ভর করলে চলবে না, প্রয়োজন সমন্বিত সামাজিক আন্দোলন।১. সীমান্তে কঠোর নজরদারি: মাদক প্রবেশের যেসমস্ত রুট বা পয়েন্ট রয়েছে, সেগুলোতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি দ্বিগুণ করতে হবে এবং মাদক সিন্ডিকেটগুলোর বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা (Zero Tolerance) নীতি বজায় রাখতে হবে।২. পারিবারিক সচেতনতা ও নজরদারি: পরিবারই মাদক প্রতিরোধের সবচেয়ে বড় দুর্গ। সন্তানদের আচরণে কোনো পরিবর্তন আসছে কি না, তারা কাদের সাথে মিশছে—সে বিষয়ে বাবা-মাকে সচেতন থাকতে হবে।৩. সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশ: তরুণ প্রজন্মকে মাদক থেকে দূরে রাখতে মাঠ পর্যায়ে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং সামাজিক ও নৈতিক শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে।৪. চিকিৎসা ও পুনর্বাসন: যারা ইতিমধ্যে আক্রান্ত হয়েছে, তাদের সমাজ থেকে দূরে না ঠেলে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। এই লক্ষ্যে দেশের বিভাগীয় শহরগুলোতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে নিরাময় কেন্দ্রগুলোর পরিধি আরও বাড়াতে হবে।উপসংহারমাদকের বিস্তার কেবল কোনো একক ব্যক্তির সমস্যা নয়, এটি একটি জাতীয় সংকট। আগামী প্রজন্মকে যদি আমরা একটি সুস্থ, নিরাপদ এবং সমৃদ্ধ বাংলাদেশ উপহার দিতে চাই, তবে আজই মাদককে 'না' বলতে হবে। দলমত-নির্বিশেষে রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারকে একযোগে এই সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই আমাদের জাগ্রত হতে হবে, অন্যথায় আগামী দিনের নেতৃত্ব দেওয়ার মতো কোনো সুস্থ প্রজন্ম আমরা খুঁজে পাব না।


দৈনিক জনকথা

সম্পাদক ও প্রকাশক: ওয়াদুদ খন্দকার
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক জনকথা
মাদকের ভয়াল গ্রাস: অপরাধের বিস্ফোরণ ও বিপন্ন আগামী প্রজন্ম ওয়াদুদ খন্দকার, দৈনিক জনকথা
0:00 0:00
1.0x