অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিল ও লোডশেডিং: জনভোগান্তির নেপথ্যে কী?
ওয়াদুদ খন্দকার, দৈনিক জনকথা
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের সাধারণ মানুষের অন্যতম প্রধান উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বিদ্যুৎ খাত। একদিকে তীব্র গরমে ওলটপালট করা লোডশেডিং, অন্যদিকে মাস শেষে সাধারণ গ্রাহকদের হাতে আসা ‘অস্বাভাবিক’ ও অসঙ্গতিপূর্ণ বিদ্যুৎ বিল। বিশেষ করে বিগত জুন ২০২৬ মাসে রাজধানীসহ দেশের মফস্বল ও গ্রামীণ এলাকায় বিদ্যুৎ ব্যবহারের তুলনায় দুই থেকে তিন গুণ বেশি বিল আসার অভিযোগ গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। ব্যবহার একই থাকার পরও প্রিপেইড ও সাধারণ মিটারে কেন বিদ্যুৎ গতিতে টাকা কেটে নেওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে গ্রাহকদের ক্ষোভ এখন চরম পর্যায়ে।
এই জনঅসন্তোষ ও তীব্র ক্ষোভের মুখে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং বিদ্যুৎ বিভাগ বিষয়টি গুরুত্বের সাথে আমলে নিয়েছে। গত ২ জুলাই বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মিরানা মাহরুখের সভাপতিত্বে দেশের সব বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি জরুরি ভার্চুয়াল পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় অতিরিক্ত বিল আসার কারণ অনুসন্ধান এবং মাঠপর্যায়ের লোডশেডিং পরিস্থিতি নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়।
অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিলের নেপথ্য কারণসমূহ
গ্রাহকদের অভিযোগ ও বিদ্যুৎ বিভাগের প্রাথমিক পর্যালোচনায় অস্বাভাবিক বা 'ভূতুড়ে' বিল আসার পেছনে বেশ কিছু কারণ উঠে এসেছে:
- করণিক ও কারিগরি ভুল: মাঠপর্যায়ে মিটার রিডারদের গাফিলতি, রিডিং না দেখেই অনুমানের ওপর ভিত্তি করে বিল তৈরি করা অথবা করণিক টাইপিং ভুলের কারণে বিল অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে।
- ডিজিটাল ও প্রিপেইড মিটারের অসঙ্গতি: অনেক গ্রাহকের অভিযোগ, প্রিপেইড মিটারে টাকা রিচার্জ করার সাথে সাথেই কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই বড় অঙ্কের টাকা কেটে নেওয়া হচ্ছে, যা সফটওয়্যার বা সিস্টেমের ত্রুটির ইঙ্গিত দেয়।
- স্ল্যাব পরিবর্তনের ফাঁদ: অতিরিক্ত গরমের কারণে লাইফলাইন গ্রাহক বা নিম্ন-মধ্যবিত্তদের বিদ্যুতের ব্যবহার কিছুটা বাড়লেই তারা উচ্চ মূল্যের পরবর্তী স্ল্যাবে (Slab) চলে যাচ্ছেন, যার ফলে বিলের অঙ্ক এক লাফে বহুগুণ হয়ে যাচ্ছে।
- কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশের অসদুপায়: মাঠপর্যায়ের কিছু বিতরণ কোম্পানির কর্মীদের বিরুদ্ধে গ্রাহকদের হয়রানি করা এবং কৃত্রিমভাবে বিল বাড়িয়ে দেখানোর মতো প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার অভাবকে অন্যতম কারণ মনে করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
বিদ্যুৎ বিভাগের কড়া নির্দেশনা ও হুঁশিয়ারি
জরুরি সভায় বিদ্যুৎ সচিব স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, বিল প্রণয়নে কোনো করণিক বা কারিগরি ভুল থাকলে তা অবিলম্বে সংশোধন করতে হবে। একই সাথে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, অতিরিক্ত বা ভূতুড়ে বিলের পেছনে বিতরণ সংস্থার কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর অসদুপায় বা অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া গ্রাহকদের দুর্ভোগ কমাতে দেশের সব জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) মাঠে থেকে তদারকি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গ্রাহকদের জন্য জরুরি পরামর্শ ও অভিযোগের হটলাইন
অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিলের শিকার গ্রাহকদের আতঙ্কিত না হয়ে প্রথমে নিজেদের মিটারের বর্তমান রিডিংয়ের সাথে বিলের কাগজের রিডিং মিলিয়ে দেখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কোনো অসঙ্গতি ধরা পড়লে সরাসরি স্থানীয় বিদ্যুৎ কার্যালয়ে যোগাযোগ করতে অথবা সরকারের নির্ধারিত অফিশিয়াল হটলাইন নম্বরগুলোতে দ্রুত অভিযোগ জানাতে বলা হয়েছে।
গ্রাহকদের সুবিধার্থে কেন্দ্রীয় ও সংস্থাভিত্তিক জরুরি হটলাইন নম্বরগুলো নিচে দেওয়া হলো:
- বিদ্যুৎ বিভাগের কেন্দ্রীয় সেবা: ১৬৯৯৯
- বিপিডিবি (BPDB): ১৬২০০
- পল্লী বিদ্যুৎ (BREB): ১৬৮৯৯
- ডিপিডিসি (DPDC): ১৬১১৬
- ডেসকো (DESCO): ১৬১২০
- নেসকো (NESCO): ১৬৬০৩
- ওজোপাডিকো (WZPDCL): ১৬১১৭
লোডশেডিং ও বিদ্যুৎ বিলের এই দ্বিমুখী চাপ থেকে সাধারণ মানুষকে মুক্তি দিতে বিদ্যুৎ খাতের ডিজিটাল ও ম্যানুয়াল উভয় পদ্ধতিতেই স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি। সরকারের এই তদন্ত নির্দেশনার সুফল যেন কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ না থেকে সাধারণ গ্রাহকের পকেট কাটা বন্ধে বাস্তব ভূমিকা রাখে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।