প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৪ জুন ২০২৬
শিক্ষার আলো বনাম নৈতিকতার অন্ধকার: মিরপুরের ঘটনা আমাদের কী শেখায়?
ওয়াদুদ খন্দকার ||
শিক্ষার আলো বনাম নৈতিকতার অন্ধকার: মিরপুরের ঘটনা আমাদের কী শেখায়?সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুরে এক বৃদ্ধা মায়ের পচনধরা মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে নাগরিক সমাজ—সবখানেই এক তীব্র ক্ষোভ এবং আত্মজিজ্ঞাসার জন্ম দিয়েছে Prothom Alo। একই ফ্ল্যাটের পাশের কক্ষে শিক্ষিত, কর্মজীবী মেয়ে থাকা সত্ত্বেও সাত-আট দিন ধরে মায়ের মৃতদেহ পড়ে রইল বিছানায়, অথচ কেউ টের পেল না Dhaka Mail—এই খবর সভ্য সমাজের প্রতিটি বিবেকবান মানুষকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। এই ঘটনা কেবল একটি পরিবারের বিচ্ছিন্ন ট্র্যাজেডি নয়, এটি আমাদের বর্তমান সমাজকাঠামো ও তথাকথিত ‘উচ্চশিক্ষা’র ভেতরের কদর্য রূপটিকেও নগ্ন করে দেখিয়েছে। এই নির্মম ঘটনা থেকে আমাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিকভাবে অনেক কিছু শেখার এবং ভাবার আছে:১. প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বনাম নৈতিক মূল্যবোধমৃত মায়ের সন্তানরা প্রত্যেকেই সমাজের শীর্ষ স্তরের মানুষ—কেউ উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, কেউ দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, আবার কেউ নামকরা স্কুলের শিক্ষিকা Prothom Alo। প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রির দিক থেকে তারা সফলতার চূড়ায়। কিন্তু এই ঘটনা প্রমাণ করে, ডিগ্রি বা অর্থনৈতিক সাফল্য কখনো মানুষের সংবেদনশীলতা ও নৈতিকতার গ্যারান্টি হতে পারে না। আমরা আমাদের সন্তানদের জিপিএ-৫ কিংবা বড় ক্যারিয়ার গড়ার প্রতিযোগিতায় নামাচ্ছি ঠিকই, কিন্তু তাদের হৃদয়ে 'মানুষ' হওয়ার কিংবা মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব পালনের ন্যূনতম মানবিক শিক্ষা দিতে ব্যর্থ হচ্ছি। ২. আত্মকেন্দ্রিক নগরজীবন ও একাকীত্বের মহামারিশহুরে জীবনে আমরা দিন দিন কতটা আত্মকেন্দ্রিক ও যান্ত্রিক হয়ে পড়ছি, এই ঘটনা তার একটি বড় প্রমাণ Prothom Alo। একই ছাদের নিচে বসবাস করেও যদি পাশের ঘরের মানুষের খোঁজ না রাখা হয়, তবে সেই ইট-পাথরের দেয়ালগুলোর সাথে সম্পর্কের দূরত্ব কতটা প্রকট, তা সহজেই অনুমেয়। সন্তান ও নাতি-নাতনিদের এই চরম উদাসীনতা ও বিচ্ছিন্নতা এক ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধির ইঙ্গিত দেয়, যেখানে রক্তের সম্পর্কগুলো কেবলই আনুষ্ঠানিকতায় রূপ নিয়েছে। ৩. মানসিক স্বাস্থ্যের অবহেলা পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা অনুযায়ী, ওই শিক্ষিকা মেয়ের মানসিক সুস্থতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে The Business Standard। আমাদের সমাজে একাকীত্ব, তীব্র মানসিক ট্রমা বা বিষণ্নতাকে প্রায়শই এড়িয়ে যাওয়া হয়। একজন মানুষ যখন নিজের চারপাশের নোংরা পরিবেশ কিংবা মায়ের মতো পরম আশ্রয়ের মৃত্যুর বিষয়েও অসাড় হয়ে যান, তখন বুঝতে হবে ভেতরে কোথাও বড় ধরনের মানসিক বিপর্যয় ঘটেছে। পরিবারের অন্য সদস্যদের উচিত ছিল শুধু মায়ের নয়, ওই ফ্ল্যাটে থাকা অন্য সদস্যের মানসিক অবস্থারও নিয়মিত খোঁজ নেওয়া। [1]৪. আইনের প্রয়োগ ও সামাজিক সচেতনতাবাংলাদেশে বাবা-মায়ের অধিকার সুরক্ষায় 'পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩' রয়েছে Prothom Alo। কিন্তু এই আইনের ব্যাপারে সাধারণ মানুষের যেমন সচেতনতা কম, তেমনি এর প্রয়োগও সীমিত। মিরপুরের এই ঘটনায় ইতিমধ্যে তদন্ত চেয়ে হাইকোর্টে রিট করা হয়েছে The Business Standard। যদি কোনো অবহেলা বা অপরাধ প্রমাণিত হয়, তবে দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো মা-বাবাকে এমন নির্মম ভাগ্যের শিকার হতে না হয়। উপসংহারমিরপুরের এই ঘটনা আমাদের এক কঠিন আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। আজ আমাদের নিজেদের প্রশ্ন করতে হবে—আমরা কেমন সমাজ গড়ে তুলছি? যে সমাজে মায়ের লাশ পচে গলে যাওয়ার পরও সন্তানেরা উদাসীন থাকে, সেই সমাজের তথাকথিত উন্নয়ন বা আভিজাত্য দিয়ে আমরা কী করব? সময় এসেছে অন্ধ ক্যারিয়ারের পেছনে ছোটার পাশাপাশি পরিবারে নৈতিকতা, সহমর্মিতা ও পারিবারিক বন্ধনকে পুনরুজ্জীবিত করার। তা না হলে, আজ যে অবহেলা নূর জাহান বেগমকে সইতে হয়েছে, আগামীকাল তা অন্য যেকোনো মা-বাবার জীবনেও ঘটে যেতে পারে। পরামর্শ: আপনার লেখাটি আরও সমৃদ্ধ করতে আপনি চাইলে সমাজের এই নৈতিক অবক্ষয় রোধে ধর্মীয় অনুশাসন বা সামাজিক প্রতিবেশীদের দায়িত্ব নিয়ে কোনো নির্দিষ্ট পয়েন্ট যোগ করতে চান কি না, আমাকে জানাতে পারেন। [
সম্পাদক ও প্রকাশক: ওয়াদুদ খন্দকার
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক জনকথা