প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৭ জুন ২০২৬
মাদকের থাবা থেকে গ্রামকে বাঁচাতে আমাদের এখনই জাগতে হবে
ওয়াদুদ খন্দকার , প্রকাশক ও সম্পাদক ||
মাদকের থাবা থেকে গ্রামকে বাঁচাতে আমাদের এখনই জাগতে হবেওয়াদুদ খন্দকার, দৈনিক জনকথাআমাদের প্রতিটি গ্রাম ছিল এক সময় পরম শান্তির নীড়। যেখানে সন্ধ্যার বাতাসে বইত স্নিগ্ধতা, আর গোধূলির আলোয় তরুণদের কলকাকলিতে মুখরিত থাকত খেলার মাঠ। মায়ের হাতের পিঠার সুবাস, ভাইয়ের সাথে খুনসুটি, আর প্রতিবেশীর সাথে সুখে-দুঃখে পাশে থাকার সেই চিরচেনা রূপটি আজ যেন রূপকথা হয়ে যাচ্ছে। আমাদের সেই মায়ায় ঘেরা গ্রামগুলোকে এক অদৃশ্য বিষাক্ত ছোবল ধীরে ধীরে গ্রাস করে নিচ্ছে। আমাদেরই বুক খালি করে, আমাদেরই অজান্তে হারিয়ে যাচ্ছে কোনো মায়ের সন্তান, কোনো বোনের ভাই, কিংবা কোনো বাবার একমাত্র ভরসা। এই নীরব ঘাতকের নাম মাদক।অনেকেই হয়তো ভাবেন—"আমার সন্তান তো ভালো আছে, আমার পরিবার তো নিরাপদ, তবে অন্যের ঘরের আগুন নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ কী?" কিন্তু একবার বুক ছুয়ে ভাবুন তো, এই উদাসীনতা কি আসলেই আপনাকে বাঁচিয়ে রাখবে? পাশের ঘরে আগুন লাগলে নিজের ঘর কি কখনো সুরক্ষিত থাকে? আজ আপনার যে প্রতিবেশী মাদকের বিষে নীল হয়ে ধুঁকে ধুঁকে মরছে, কাল সেই বিষের বিষাক্ত হাওয়া আপনার নিজের সন্তানকেও স্পর্শ করবে না—তার গ্যারান্টি কে দেবে? এই নীরবতা আর ‘আমার কী’ ভাবার মানসিকতাই আমাদের সবচেয়ে বড় শত্রু। মাদক শুধু একটি জীবন কেড়ে নেয় না; এটি একটি হাসিখুশি পরিবারকে জীবন্ত লাশে পরিণত করে, একটি সাজানো গ্রামকে নরকে রূপান্তর করে। আপনি যদি আজ প্রতিবাদ না করেন, তবে আগামী দিনের ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে কাঁদার জন্যও কেউ অবশিষ্ট থাকবে না।আজই সময় এসেছে ঘুরে দাঁড়ানোর, দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া এই সমাজকে বাঁচানোর। আমাদের পাড়া, মহল্লা আর ভালোবাসার গ্রামে মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহনশীলতার শপথ নিতে হবে। যে হাত আমাদের সন্তানদের মুখে বিষ তুলে দেয়, যে সমাজবিরোধী টাকা আর ক্ষমতার লোভে তরুণ সমাজকে ধ্বংস করে, তাদের কোনো ক্ষমা নেই। কোনো মাদক ব্যবসায়ী, কারবারি বা তাদের পেছনে থাকা গডফাদারদের সাথে কোনো আপস হতে পারে না।আমাদের বুক দিয়ে আগলাতে হবে নিজের গ্রামকে:দুর্ভেদ্য সামাজিক প্রাচীর: গ্রামের মুরব্বি, ইমাম, শিক্ষক আর ঘুমন্ত যুবসমাজকে জাগিয়ে তুলুন। সবাই মিলে এক হয়ে মাদকের বিরুদ্ধে এমন এক সামাজিক প্রতিরোধ গড়ুন, যেন কোনো অপরাধী গ্রামে মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে।হৃদয় ছোঁয়া সচেতনতা: শুধু কাগজে-কলমে নয়, উঠান বৈঠক আর ধর্মীয় আলোচনার মাধ্যমে প্রতিটি বাবা-মায়ের হৃদয়ে এই বার্তা পৌঁছে দিন। সন্তানদের একাকীত্ব বুঝুন, তাদের সময় দিন, যেন কোনো বিষাদ তাদের মাদকের দিকে ঠেলে না দেয়।আইনের বজ্রকঠিন প্রয়োগ: মাদকের কোনো সামান্যতম আলামত বা আনাগোনা দেখলেই ভয় না পেয়ে, বুক চিতিয়ে দাঁড়ান। তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয় প্রশাসন ও বাংলাদেশ পুলিশের সহায়তা নিন। অপরাধীকে সমাজ থেকে উপড়ে ফেলুন।ভালোবাসার হাত ও নিরাময়: যে তরুণটি ভুল করে, অন্ধকারের চোরাবালিতে পা হারিয়ে ফেলেছে—তাকে সমাজ থেকে ছুড়ে ফেলবেন না। সে তো আমাদেরই কারো না কারো সন্তান। তাকে ঘৃণা না করে পরম মমতায় বুকে টেনে নিন। সঠিক চিকিৎসা ও মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের মাধ্যমে তাকে আবার আলোর জীবনে ফিরিয়ে আনুন।মাদকের বিরুদ্ধে এই লড়াই কোনো ব্যক্তি বা দলের নয়, এই লড়াই আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার। আপনার-আমার সম্মিলিত ভালোবাসাই পারে আমাদের গ্রামগুলোকে আবার সেই সোনালী, নিরাপদ দিনগুলো ফিরিয়ে দিতে। আসুন, আর একটি মুহূর্তও নষ্ট না করে আজই মায়ের নামে, মাটির নামে প্রতিজ্ঞা করি—"মাদককে না বলি, সুন্দর ও নিরাপদ সমাজ গড়ি।"মনে রাখবেন, আপনার পরিবার ও প্রাণের চেয়ে প্রিয় গ্রামের সুরক্ষার দায়িত্ব আজ আপনারই কাঁধে। আপনি না জাগলে, আর কে জাগবে?
সম্পাদক ও প্রকাশক: ওয়াদুদ খন্দকার
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক জনকথা