প্রিন্ট এর তারিখ : ০২ জুলাই ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০২ জুলাই ২০২৬
অন্ধকারে কালীগঞ্জ: পল্লী বিদ্যুতের চরম অব্যবস্থাপনা ও গ্রাহক ভোগান্তির শেষ কোথায়? ওয়াদুদ খন্দকার, দৈনিক জনকথা
ওয়াদুদ খন্দকার ||
অন্ধকারে কালীগঞ্জ: পল্লী বিদ্যুতের চরম অব্যবস্থাপনা ও গ্রাহক ভোগান্তির শেষ কোথায়?ওয়াদুদ খন্দকার, দৈনিক জনকথা একটি দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হলো নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ। কিন্তু গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার সাধারণ মানুষের জন্য এই বিদ্যুৎ এখন এক চরম বিভীষিকার নাম। গত কয়েক বছর ধরে কালীগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির (পবিস) সীমাহীন অব্যবস্থাপনা, লোডশেডিংয়ের নামে গ্রাহকদের সাথে লুকোচুরি এবং দায়িত্বজ্ঞানহীনতা উপজেলার মানুষের জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। এখন সময় এসেছে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সম্মিলিত আওয়াজ তোলার।১. লোডশেডিং নয়, এ যেন ‘বিদ্যুতের আসা-যাওয়ার খেলা’কালীগঞ্জে লোডশেডিং এখন কোনো নিয়ম মেনে চলে না। দিনে-রাতে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কতবার বিদ্যুৎ যায় এবং আসে, তার হিসাব রাখা অসম্ভব। তীব্র গরমে যখন মানুষের নাভিশ্বাস ওঠার দশা, তখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ গায়েব থাকে। অনেক সময় সামান্য বাতাস বা গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হলেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়, যা মেরামতের নাম করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, এমনকি পুরো দিন পার করে দেওয়া হয়। আধুনিক প্রযুক্তির এই যুগে এমন ভঙ্গুর বিদ্যুৎ ব্যবস্থা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।২. ভুতুড়ে বিল ও অর্থনৈতিক শোষণগ্রাহকদের সবচেয়ে বড় ক্ষোভের জায়গা হলো পল্লী বিদ্যুতের ‘ভুতুড়ে বিল’। অনেক গ্রাহকের অভিযোগ, মিটার রিডিং না দেখেই অফিসে বসে কাল্পনিক বিল তৈরি করা হয়। গত কয়েক মাসে অনেক সাধারণ পরিবারের বিল স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণ বা তিনগুণ এসেছে। এই অন্যায্য বিলের প্রতিবাদ করতে গেলে গ্রাহকদের পোহাতে হয় চরম হয়রানি। বিদ্যুৎ অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশের বিরুদ্ধে অবৈধ সংযোগ বাণিজ্য এবং ঘুষ লেনদেনের অভিযোগও নতুন কিছু নয়।৩. থমকে গেছে জনজীবন ও ব্যবসা-বাণিজ্যপল্লী বিদ্যুতের এই খামখেয়ালিপনার চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে কালীগঞ্জের স্থানীয় অর্থনীতিকে।শিক্ষার্থী: পরীক্ষার মৌসুমে বিদ্যুৎ না থাকায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প: এলাকার কলকারখানা, রাইস মিল, এবং ওয়ার্কশপগুলো বিদ্যুতের অভাবে সময়মতো উৎপাদন করতে পারছে না। ফলে ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়ছেন।ফ্রিল্যান্সার ও অনলাইন উদ্যোক্তা: নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট ও বিদ্যুতের অভাবে তরুণ ফ্রিল্যান্সাররা তাদের পেশাগত কাজ হারাচ্ছেন।৪. সংস্কারহীন জরাজীর্ণ লাইন ও দুর্ঘটনাকালীগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় এখনো বহু বছরের পুরনো জরাজীর্ণ তার এবং বাঁশের খুঁটি দিয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ চালানো হচ্ছে। একটু ঝড়-বৃষ্টি হলেই তার ছিঁড়ে পড়ে দুর্ঘটনা ঘটে। এই লাইনগুলো সংস্কার বা আধুনিকায়নের কোনো কার্যকরী উদ্যোগ চোখে পড়ে না। অথচ প্রতি বছর রক্ষণাবেক্ষণের নামে বিপুল অর্থ বরাদ্দ দেখানো হয়।আমাদের দাবি এবং এখনই আওয়াজ তোলার আহ্বানকালীগঞ্জের সাধারণ মানুষ আর কতদিন এই নীরব অত্যাচার সহ্য করবে? করোনাকালীন ধাক্কা সামলে যখন মানুষ ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, তখন বিদ্যুতের এই অব্যবস্থাপনা আমাদের পেছনে টেনে ধরছে। এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য আমাদের এখনই সোচ্চার হতে হবে। কালীগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের স্পষ্ট দাবি:১. যৌক্তিক ও পূর্বঘোষিত লোডশেডিং: কোনো নোটিশ ছাড়া যখন-তখন বিদ্যুৎ বন্ধ করা বন্ধ করতে হবে।২. ভুতুড়ে বিলের অবসান: ডিজিটাল মিটারের সঠিক রিডিং অনুযায়ী বিল নিশ্চিত করতে হবে এবং দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।৩. দ্রুত কাস্টমার সার্ভিস: গ্রাহকদের অভিযোগ পাওয়ার পর দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য দক্ষ মনিটরিং সেল গঠন করতে হবে।৪. অবকাঠামোগত উন্নয়ন: উপজেলার জরাজীর্ণ তার, ট্রান্সফরমার এবং খুঁটি দ্রুত পরিবর্তন করে আধুনিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।উপসংহার:বিদ্যুৎ আমাদের অধিকার, কোনো দয়া নয়। আমরা নিয়মিত বিল পরিশোধ করেও কেন অন্ধকারের শাস্তি ভোগ করব? কালীগঞ্জের সচেতন নাগরিক, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী এবং যুবসমাজকে এই অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আসুন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে স্থানীয় প্রশাসনের স্মারকলিপি প্রদান—সব স্তরে আমরা আমাদের অধিকারের আওয়াজ তুলি। যতক্ষণ না কালীগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি তাদের সেবার মান উন্নত করছে, ততক্ষণ আমাদের এই প্রতিবাদ চলবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: ওয়াদুদ খন্দকার
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক জনকথা