প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ জুলাই ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৫ জুলাই ২০২৬
বাংলাদেশের বিশ্বকাপ উন্মাদনা ও আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল ট্রিলজি
ওয়াদুদ খন্দকার ||
বাংলাদেশের বিশ্বকাপ উন্মাদনা ও আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল ট্রিলজিফিফা বিশ্বকাপে বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দল খেলে না, বিশ্বমঞ্চের মূল লড়াই থেকে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা অনেক দূরে। কিন্তু তাতে কী? প্রতি চার বছর পর পর যখন ফুটবল বিশ্বকাপ আসে, তখন এই ভৌগোলিক সীমারেখা ছাপিয়ে বাংলাদেশ নিজেই পরিণত হয় এক টুকরো ফুটবল বিশ্বমঞ্চে। ল্যাটিন আমেরিকার দেশ আর্জেন্টিনা কিংবা ব্রাজিলের সাথে বাংলাদেশের সরাসরি ভৌগোলিক, রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক কোনো যোগাযোগ নেই বললেই চলে, তবুও প্রতি বিশ্বকাপে এ দেশের কোটি কোটি মানুষ মেতে ওঠে এক অভাবনীয় উন্মাদনায়।দুই ভাগে বিভক্ত বাংলাদেশ: আর্জেন্টিনা বনাম ব্রাজিলবিশ্বকাপ শুরু হওয়া মাত্রই পুরো বাংলাদেশ যেন অলিখিতভাবে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ হয়ে যায়—একদিকে আকাশী-সাদা (আর্জেন্টিনা) আর অন্যদিকে হলুদ-সবুজ (ব্রাজিল)।আর্জেন্টিনা ভক্তদের আবেগ ও ম্যারাডোনা-মেসি বন্দনা: আশির দশকে ডিয়েগো ম্যারাডোনার জাদুকরী ফুটবল দেখে বাংলাদেশে আর্জেন্টিনা সমর্থনের যে জোয়ার তৈরি হয়েছিল, তা একবিংশ শতাব্দীতে এসে লিওনেল মেসির জাদুতে আরও বহুগুণে শক্তিশালী হয়েছে। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম—সবখানেই চলে আলবিসেলেস্তেদের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই। কাতার বিশ্বকাপে মেসির হাতে কাপ ওঠার পর বাংলাদেশে যে মহোৎসব হয়েছিল, তা খোদ আর্জেন্টিনার গণমাধ্যম এবং ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (AFA) নজর কেড়েছিল, যার ফলস্বরূপ ঢাকায় দীর্ঘ ৪০ বছর পর আর্জেন্টিনার দূতাবাস পুনরায় চালু করা হয়। বর্তমানে চলমান ২০২৬ বিশ্বকাপেও সেই উন্মাদনার বিন্দুমাত্র কমতি নেই।ব্রাজিলের সাম্বা ফুটবলের মোহ: সেলেসাওদের পাঁচবারের বিশ্বজয় এবং পেলের ঐতিহ্য বাংলাদেশে ব্রাজিলের এক বিশাল সমর্থক গোষ্ঠী তৈরি করেছে। রোনালদিনহো, কাকা থেকে শুরু করে নেইমার জুনিয়র পর্যন্ত ব্রাজিলের সুন্দর ফুটবলের বা 'জোগো বোনিতো'র প্রেমে মজে আছে এ দেশের লাখো তরুণ।উন্মাদনার বহুমাত্রিক রূপবিশ্বকাপের সময় বাংলাদেশের প্রতিটি কোণায় অদ্ভুত সব কাণ্ডকীর্তি চোখে পড়ে:পতাকার প্রতিযোগিতা: পাড়া-মহল্লায় কিলোমিটারের পর কিলোমিটার লম্বা পতাকা বানানোর এক নীরব প্রতিযোগিতা শুরু হয়। ছাদ, বারান্দা কিংবা গাছের মগডালে উড়তে থাকে পছন্দের দলের পতাকা।বিশাল স্ক্রিনে ম্যাচ দেখা: বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস, বড় বড় মোড় কিংবা চায়ের দোকানে জায়ান্ট স্ক্রিন বা প্রজেক্টর বসিয়ে হাজার হাজার মানুষ একসাথে মধ্যরাতে চিৎকার করে ম্যাচ উপভোগ করে।দেয়াল লিখন ও বাড়ি রঙ করা: নিজের বাড়িকে প্রিয় দলের পতাকার রঙে রাঙিয়ে দেওয়া কিংবা দেয়ালে দেয়ালে প্রিয় তারকাদের ছবি আঁকা বাংলাদেশের এক চিরচেনা রূপ।অন্যান্য দলের উদীয়মান সমর্থক গোষ্ঠীফুটবল উন্মাদনা শুধু আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিলেই সীমাবদ্ধ নেই। বর্তমান প্রজন্মের ফুটবল ভক্তদের মাঝে ইউরোপীয় ফুটবলের ক্লাবিজম এবং বড় তারকাদের প্রভাবের কারণে সমর্থনের বৃত্তে কিছুটা বৈচিত্র্য এসেছে:ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পর্তুগাল: রোনালদোর বিশাল ব্যক্তিগত ভক্তকুলের কারণে পর্তুগাল দলের এখন বাংলাদেশে বড়সড় সমর্থক তৈরি হয়েছে।ইউরোপীয় পরাশক্তি: কিলিয়ান এমবাপের ফ্রান্স, তরুণ তুর্কিদের নিয়ে গড়া জার্মানি, স্পেন এবং ইংল্যান্ডের মতো দলগুলোর আধুনিক এবং গতিশীল ফুটবলের কারণে তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ এখন এই দলগুলোর দিকেও ঝুঁকছে।বৈরিতার আড়ালে সামাজিক বন্ধনবিশ্বকাপের সময় বন্ধু বন্ধুর শত্রু বনে যায়, বাবা-ছেলের মাঝে চলে কথার লড়াই, আর প্রতিবেশীদের মধ্যে জমে ওঠে তুমুল তর্ক। মাঝে মাঝে এই অতি-উন্মাদনা বা বিতর্ক হাতাহাতি কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘর্ষের রূপ নিলেও, দিনশেষে এই ফুটবল বিশ্বকাপ বাংলাদেশের মানুষকে এক অন্যরকম আনন্দ দেয়। সব ভেদাভেদ ভুলে গভীর রাতে একসাথে বসে খেলা দেখা, গোল উদযাপনে মেতে ওঠা আর পরদিন সকালে সেই একই টেবিলে বসে চায়ের কাপে ঝড় তোলা—এটাই বাংলাদেশের ফুটবল সংস্কৃতির সৌন্দর্য।উপসংহার:বাংলাদেশ হয়তো কোনোদিন বিশ্বকাপে খেলবে, সেই স্বপ্ন এ দেশের প্রতিটি ফুটবলপ্রেমী বুক দিয়ে আগলে রাখে। তবে যতদিন সেই স্বপ্ন সত্যি না হচ্ছে, ততদিন অন্যের জয়ে নিজেদের আনন্দ খুঁজে নেওয়ার এই যে অদ্ভুত ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, তা পৃথিবীর আর কোথাও খুঁজে পাওয়া মেলা ভার। বাংলাদেশে ফুটবল কেবল একটি খেলা নয়, এটি এক মাসব্যাপী চলমান এক আবেগের উৎসব।
সম্পাদক ও প্রকাশক: ওয়াদুদ খন্দকার
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক জনকথা