প্রিন্ট এর তারিখ : ১২ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বেলাই বিলের সৌন্দর্য টানছে পর্যটক: বাধা সরু সড়ক ও বর্জ্য
ওয়াদুদ খন্দকার ||
বেলাই বিলের সৌন্দর্য টানছে পর্যটক: বাধা সরু সড়ক ও বর্জ্য নিজস্ব প্রতিবেদক | গাজীপুরপ্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপরূপ লীলাভূমি গাজীপুরের ঐতিহ্যবাহী বেলাই বিল। চেলাই নদী সংলগ্ন বাড়িয়া, ব্রাহ্মণগাঁও, বক্তারপুর ও বামচিনি মৌজার গ্রামগুলো ঘেরা প্রায় ৮ বর্গমাইল বিস্তৃত এই জলাভূমি এখন যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি দূর করার এক জনপ্রিয় মাধ্যম হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে চারদিকের থৈ থৈ পানি আর সবুজ প্রকৃতির মেলবন্ধন যেকোনো পর্যটকের মন কেড়ে নেয়। তবে অপার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও অবকাঠামোগত সমস্যা এবং যত্রতত্র বর্জ্য ফেলার কারণে এই পর্যটন কেন্দ্রটির ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে পড়ছে।রূপসী বেলাই বিলের হাতছানিগাজীপুর সদর ও কালীগঞ্জ উপজেলার সীমানা ঘেঁষে বয়ে যাওয়া এই বিলটি ভ্রমণপিপাসুদের কাছে এক বড় আকর্ষণ। বর্ষায় এর রূপ যেন দ্বিগুণ হয়ে যায়। প্রতিদিন শত শত মানুষ যান্ত্রিক কোলাহল ছেড়ে একটু শান্তির খোঁজে এখানে ছুটে আসেন। স্থানীয় নৌকার মাঝিরা পর্যটকদের নিয়ে ঘুরে বেড়ান বিলের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। শুধু প্রকৃতিপ্রেমীই নয়, বিলের চারপাশের মানুষের জীবন-জীবিকাও আবর্তিত হয় এই জলাভূমিকে কেন্দ্র করে। সরকারি-বেসরকারি সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এটি একটি আধুনিক ও স্বয়ংসম্পূর্ণ পর্যটন এলাকা হিসেবে বিশ্বের দরবারে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।সংকটের মূলে সরু সড়ক ও যানজটবেলাই বিলের সৌন্দর্য পর্যটকদের টানলেও এখানে আসার পথটি মোটেও সুগম নয়। বিলে প্রবেশের মূল সড়কগুলো অত্যন্ত সরু ও অপ্রশস্ত। ছুটির দিনগুলোতে যখন পর্যটকদের ভিড় বাড়ে, তখন এই সরু রাস্তায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। বড় কোনো যানবাহন দূরৰে থাক, দুটি ছোট গাড়িও ঠিকমতো যাতায়াত করতে পারে না। ফলে যাতায়াতের এই চরম ভোগান্তি অনেক পর্যটককে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও নিয়মিত দর্শনার্থীদের দাবি, পর্যটনের প্রসার ঘটাতে হলে সবার আগে বিলে প্রবেশের সড়কগুলো দ্রুত প্রশস্ত ও আধুনিকায়ন করা জরুরি।প্লাস্টিক ও বর্জ্যের দূষণে ম্লান হচ্ছে সৌন্দর্যবেলাই বিলের মূল শক্তিই হলো এর স্বাভাবিক জলাভূমি ও বিশুদ্ধ পরিবেশ। কিন্তু বর্তমানে সেই পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে। বেড়াতে আসা অসচেতন পর্যটকদের ফেলে যাওয়া প্লাস্টিক বোতল, পলিথিন, চিপসের প্যাকেটসহ নানা রকমের বর্জ্য বিলের পানিতে ও চারপাশে স্তূপ আকারে জমা হচ্ছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যবস্থা না থাকায় এই প্লাস্টিক বর্জ্য পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে এবং বিলের স্বাভাবিক সৌন্দর্যকে ম্লান করে দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ রক্ষা না করে পর্যটনের উন্নয়ন করা সম্ভব নয়।নিরাপত্তা ও অন্যান্য অভাবসড়ক ও বর্জ্য সমস্যার পাশাপাশি এখানে রয়েছে পর্যটকদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তার অভাব। দূর-দূরান্ত থেকে আসা পরিবার বা নারীদের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো বিশ্রামাগার, ওয়াশরুম বা মানসম্মত খাবারের হোটেলের তীব্র সংকট রয়েছে। সন্ধ্যার পর পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা না থাকায় অনেক পর্যটকই নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন।সম্ভাবনা জাগাতে করণীয়বেলাই বিলকে একটি সফল পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে সমন্বিত উদ্যোগের বিকল্প নেই।১. যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন: বিলে প্রবেশের প্রধান সড়কগুলো দ্রুত প্রশস্ত করতে হবে।২. বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ ও পরিচ্ছন্নতা: বিলে প্লাস্টিক ও পলিথিনের ব্যবহার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং নির্দিষ্ট দূরত্বে ডাস্টবিনের ব্যবস্থা রাখতে হবে।৩. নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ: পর্যটকদের নির্বিঘ্নে ঘুরে বেড়ানোর জন্য ট্যুরিস্ট পুলিশের নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।৪. পরিবেশবান্ধব স্থাপনা: প্রাকৃতির ক্ষতি না করে বসার স্থান, শৌচাগার ও ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণ করা যেতে পারে।সরকারি ও বেসরকারি নানামুখী টেকসই উদ্যোগের মাধ্যমেই কেবল বেলাই বিলের এই সংকট দূর করা সম্ভব। প্রকৃতির এই অপার দানকে বাঁচিয়ে রেখে পরিবেশবান্ধব পর্যটন গড়ে তুলতে পারলে এটি যেমন স্থানীয় অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করবে, তেমনি দেশের পর্যটন শিল্পেও এক নতুন দিগন্তের সূচনা করবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: ওয়াদুদ খন্দকার
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক জনকথা