প্রিন্ট এর তারিখ : ২০ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২০ অক্টোবর ২০২৬
৩২তম মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি: তুমুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের প্রথম চেয়ারম্যান কালু মিয়া
ওয়াদুদ খন্দকার ||
৩২তম মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি: তুমুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের প্রথম চেয়ারম্যান কালু মিয়া ওয়াদুদ খন্দকার, দৈনিক জনকথাআজ ২০ অক্টোবর, গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী তুমুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের স্বাধীনতা-পরবর্তীকালের প্রথম চেয়ারম্যান, জনমানুষের নেতা জনাব ইসলামউদ্দিন আহমদ ওরফে কালু মিয়ার ৩২তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৯৪ সালের এই দিনে তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তুমুলিয়া তথা কালীগঞ্জের সর্বস্তরের মানুষের হৃদয়ে তিনি আজও এক অহিংস, সততা ও ত্যাগের প্রতীক হিসেবে উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে আছেন।স্বাধীনতার পর এক চরম সংকটকালে তুমুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন কালু মিয়া। তাঁর যোগ্য সহযোগী ও ডেপুটি হিসেবে পাশে ছিলেন জনাব টমাস পালমা। তৎকালীন সময়ে ধর্ম, বর্ণ বা সম্প্রদায় কোনো কিছুই কালু মিয়ার জনপ্রিয়তায় বাঁধা হতে পারেনি। তিনি ছিলেন প্রকৃত অর্থেই অসাম্প্রদায়িক এবং সব মানুষের কাছে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য এক অনন্য ব্যক্তিত্ব।জনপ্রতিনিধি থেকে 'সর্বহারা': এক সততার নজিরআজকের দিনে রাজনীতি যেখানে ভাগ্য বদলের হাতিয়ার, সেখানে কালু মিয়া ছিলেন সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। আচরণে ও সম্পদে উভয় দিক থেকেই তিনি ছিলেন সর্বহারা শ্রেণীর প্রকৃত প্রতিনিধি। জনপ্রতিনিধি হিসেবে নিজের মেয়াদ শেষ করার পর তিনি অর্থনৈতিকভাবে আরও দরিদ্র নাগরিকে পরিণত হন। সততা যে একজন মানুষকে কতটা নিঃস্ব কিন্তু আত্মিকভাবে ধনী করতে পারে, তার জ্বলন্ত প্রমাণ কালু চেয়ারম্যান।পরবর্তীতে সাত সন্তানের ভরণ-পোষণের তাগিদে এবং জীবনসংগ্রামের নির্মম বাস্তবতায় তিনি ঢাকায় চলে আসতে বাধ্য হন। সেখানেও শুরু হয় তাঁর নিরন্তর জীবনযুদ্ধ। অভাব-অনটন তাঁর নিত্যসঙ্গী হলেও, সুবিধাবাদের কাছে তিনি কখনো নিজের আদর্শকে সমর্পণ করেননি। শত কষ্টকে হাসিমুখে বরণ করেছেন, কিন্তু অন্যায়ের সাথে আপস করেননি।মানবতার মূর্ত প্রতীক১৯৭৪ সালের দেশব্যাপী দুর্ভিক্ষের কালিময় দিনগুলোতে তুমুলিয়ার প্রান্তিক মানুষদের বাঁচিয়ে রাখতে তিনি নিজের সর্বোচ্চ বিলিয়ে দিয়েছিলেন। এলাকায় লঙ্গরখানা খুলে শত শত ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে অন্ন তুলে দিয়েছিলেন এই কর্মবীর।এমনকি ঢাকায় অবস্থানকালেও তাঁর মন পড়ে থাকত নিজ এলাকার মানুষের কাছে। কালীগঞ্জ বা তুমুলিয়ার পরিচিত-অপরিচিত কোনো মানুষ চিকিৎসার জন্য ঢাকায় এলে, কালু মিয়া খবর পাওয়া মাত্রই ছুটে যেতেন। গণপরিবহনের খরচ বাঁচিয়ে কিংবা কেবলই ভালোবাসার টানে ৫ থেকে ১০ কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে হাসপাতালে বা রোগীর বাসায় গিয়ে খোঁজখবর নিতেন। পরোপকারের এমন দৃষ্টান্ত সমসাময়িক ইতিহাসে বিরল।শিক্ষা ও সংস্কৃতির অগ্রদূতকালু মিয়া মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতেন—শিক্ষা ও সংস্কৃতি ছাড়া মানুষের মুক্তি অসম্ভব। তাঁরই দূরদর্শী মেয়াদে এবং প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ঐতিহযবাহী 'ভাইয়াসূতী উচ্চ বিদ্যালয়'। এছাড়া কালীগঞ্জের সোম এলাকায় একটি উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হোক, তা তিনি মনে-প্রাণে চাইতেন এবং সেই স্বপ্নের বীজ বুনে গিয়েছিলেন মানুষের মাঝে। ভৌগোলিক ও প্রশাসনিক সংস্কারেও তাঁর ভূমিকা ছিল অনন্য। তুমুলিয়া ইউনিয়নকে রূপগঞ্জ থানা থেকে কেটে কালীগঞ্জ থানার অন্তর্ভুক্ত করার ব্যাপারে তিনি অগ্রগণ্য ও ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন।আজ তাঁর ৩২তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তুমুলিয়াসহ সমগ্র কালীগঞ্জবাসী তাঁকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে। ক্ষমতার মোহে অন্ধ এই অবক্ষয়ের যুগে কালু চেয়ারম্যানের মতো সৎ, নিবেদিতপ্রাণ ও নিঃস্বার্থ মানুষের জীবনী আমাদের বারবার পথ দেখায়।ওপারে ভালো থাকুন গণমানুষের প্রিয় কালু চেয়ারম্যান। আপনার সততা ও ত্যাগের আলো প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে পড়ুক।
সম্পাদক ও প্রকাশক: ওয়াদুদ খন্দকার
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক জনকথা