ঢাকা    বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬, ১১ আষাঢ় ১৪৩৩
দৈনিক জনকথা

মাটির স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা: সারের ভারসাম্যহীন ব্যবহারে বাড়ছে ঝুঁকি ওয়াদুদ খন্দকার, দৈনিক জনকথা



মাটির স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা: সারের ভারসাম্যহীন ব্যবহারে বাড়ছে ঝুঁকি  ওয়াদুদ খন্দকার, দৈনিক জনকথা

মাটির স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা: সারের ভারসাম্যহীন ব্যবহারে বাড়ছে ঝুঁকি

ওয়াদুদ খন্দকার, দৈনিক জনকথা

বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ফসলের উৎপাদন বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। তবে উৎপাদন বাড়াতে গিয়ে আমরা অজান্তেই দেশের কৃষিজমির অপূরণীয় ক্ষতি করে চলছি। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিবেদনে বাংলাদেশের কৃষিতে সারের ব্যবহার নিয়ে এক উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ কৃষক ফসলে সুষম সারের পরিবর্তে নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম ও সালফারের অসম বা ভারসাম্যহীন মিশ্রণ ব্যবহার করছেন। মাত্র ৫ শতাংশ কৃষক ফসলে সঠিক মাত্রায় ভারসাম্যপূর্ণ সার ব্যবহার করেন। সারের এই অপপ্রয়োগ দেশের মাটির দীর্ঘমেয়াদী উর্বরতা ও সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তাকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলছে। 

সারের অসম মিশ্রণ ও বর্তমান প্রবণতা

জমিতে কাঙ্ক্ষিত ফসল পেতে নাইট্রোজেন (ইউরিয়া), ফসফরাস (টিএসপি/ডিএপি), পটাশিয়াম (এমওপি) ও সালফারের (জিপসাম) সঠিক অনুপাত বজায় রাখা জরুরি। একেই বলা হয় সুষম সার। কিন্তু মাঠপর্যায়ে কৃষকদের মধ্যে সুষম সার ব্যবহারের সচেতনতা অত্যন্ত কম। বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, দেশের কৃষকদের মধ্যে অতিরিক্ত মাত্রায় ফসফরাস ব্যবহার এবং প্রয়োজনীয় সালফার ব্যবহার না করার অর্থাৎ সালফারের ঘাটতি রাখার একটি বড় প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। 

কৃষকদের একটি সাধারণ ধারণা রয়েছে যে, বেশি সার দিলেই বেশি ফলন হবে। বিশেষ করে ইউরিয়া ও ফসফরাস জাতীয় সার জমিতে দ্রুত দৃশ্যমান পরিবর্তন আনে বলে কৃষকরা এগুলো প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি ব্যবহার করেন। বিপরীতে, সালফারের মতো অতি প্রয়োজনীয় অণুখাদ্যের ব্যবহারকে তারা অবহেলা করছেন। 

মাটির দীর্ঘমেয়াদী উর্বরতা হ্রাস 

মাটি একটি জীবন্ত উপাদান। এর নিজস্ব একটি খাদ্যচক্র ও স্বাস্থ্য রয়েছে। সুষম সার না পেয়ে বছরের পর বছর অতিরিক্ত রাসায়নিক ও অসম সার ব্যবহারের ফলে মাটির প্রাকৃতিক গুণাগুণ নষ্ট হচ্ছে। অতিরিক্ত ফসফরাস ব্যবহারের ফলে মাটিতে অন্যান্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান উদ্ভিদের গ্রহণ করার ক্ষমতা কমে যায়। আবার সালফারের ঘাটতির কারণে ফসলের গুণগত মান ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পায়। ফলে মাটি ধীরে ধীরে তার স্বাভাবিক উৎপাদন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে, যা দীর্ঘমেয়াদে মাটিকে বন্ধ্যাত্বের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। 

খাদ্য নিরাপত্তায় বড় ঝুঁকি 

৯৫ শতাংশ কৃষকের এই ভুল পদ্ধতির চাষাবাদ সরাসরি দেশের খাদ্য নিরাপত্তার ওপর আঘাত হানছে। সাময়িকভাবে হয়তো রাসায়নিক সারের জোরে কিছুটা বেশি ফলন মিলছে, কিন্তু মাটির উর্বরতা এভাবে কমতে থাকলে আগামী কয়েক দশকে ফসলের উৎপাদন ধস নামতে পারে। তাছাড়া, মাটির পুষ্টির ভারসাম্যহীনতার কারণে উৎপাদিত ফসলের পুষ্টিমানও কমে যাচ্ছে। ফলে জেনেশুনেই আমরা এক নীরব পুষ্টিহীনতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, যা জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় হুমকি। 

উত্তরণের উপায় ও করণীয়

এই বিপর্যয় থেকে বাঁচতে হলে এখনই রাষ্ট্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে:

১. কৃষক পর্যায়ে ব্যাপক সচেতনতা: মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সুষম সারের গুরুত্ব কৃষকদের বোঝাতে হবে। মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তাদের (উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা) মাধ্যমে উঠান বৈঠক ও প্রশিক্ষণের আয়োজন করতে হবে।
২. সহজ উপায়ে মাটি পরীক্ষা: দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে মাটি পরীক্ষার সুবিধা বাড়াতে হবে, যাতে কৃষকরা তাদের জমির মাটির প্রকৃত পুষ্টি চাহিদা জেনে সেই অনুযায়ী নির্দিষ্ট পরিমাণ সার ব্যবহার করতে পারেন।
৩. ডিজিটাল কৃষি সেবার বিস্তার: মোবাইল অ্যাপস বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কোন ফসলে কী পরিমাণ সার লাগবে, তা সহজে কৃষকদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।
৪. জৈব সারের ব্যবহারে উৎসাহ প্রদান: রাসায়নিক সারের ওপর চাপ কমাতে কম্পোস্ট, কেঁচো সার (ভার্মিকম্পোস্ট) ও সবুজ সার ব্যবহারের হার বাড়াতে হবে। 

উপসংহার

জমির মাটি বাঁচলে তবেই বাঁচবে দেশের কৃষি এবং নিশ্চিত হবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের খাদ্য নিরাপত্তা। ৯৫ শতাংশ কৃষকের সুষম সার ব্যবহার না করার এই পরিসংখ্যানটি কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি আমাদের কৃষিখাতের জন্য একটি লাল সংকেত। টেকসই ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের লক্ষ্যে অবিলম্বে সারের এই অসম মিশ্রণ ব্যবহার বন্ধ করে কৃষকদের শতভাগ সুষম সার ব্যবহারে অভ্যস্ত করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। 


দৈনিক জনকথা

বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬


মাটির স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা: সারের ভারসাম্যহীন ব্যবহারে বাড়ছে ঝুঁকি ওয়াদুদ খন্দকার, দৈনিক জনকথা

প্রকাশের তারিখ : ২৩ জুন ২০২৬

featured Image

মাটির স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা: সারের ভারসাম্যহীন ব্যবহারে বাড়ছে ঝুঁকি

ওয়াদুদ খন্দকার, দৈনিক জনকথা

বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ফসলের উৎপাদন বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। তবে উৎপাদন বাড়াতে গিয়ে আমরা অজান্তেই দেশের কৃষিজমির অপূরণীয় ক্ষতি করে চলছি। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিবেদনে বাংলাদেশের কৃষিতে সারের ব্যবহার নিয়ে এক উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ কৃষক ফসলে সুষম সারের পরিবর্তে নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম ও সালফারের অসম বা ভারসাম্যহীন মিশ্রণ ব্যবহার করছেন। মাত্র ৫ শতাংশ কৃষক ফসলে সঠিক মাত্রায় ভারসাম্যপূর্ণ সার ব্যবহার করেন। সারের এই অপপ্রয়োগ দেশের মাটির দীর্ঘমেয়াদী উর্বরতা ও সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তাকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলছে। 

সারের অসম মিশ্রণ ও বর্তমান প্রবণতা

জমিতে কাঙ্ক্ষিত ফসল পেতে নাইট্রোজেন (ইউরিয়া), ফসফরাস (টিএসপি/ডিএপি), পটাশিয়াম (এমওপি) ও সালফারের (জিপসাম) সঠিক অনুপাত বজায় রাখা জরুরি। একেই বলা হয় সুষম সার। কিন্তু মাঠপর্যায়ে কৃষকদের মধ্যে সুষম সার ব্যবহারের সচেতনতা অত্যন্ত কম। বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, দেশের কৃষকদের মধ্যে অতিরিক্ত মাত্রায় ফসফরাস ব্যবহার এবং প্রয়োজনীয় সালফার ব্যবহার না করার অর্থাৎ সালফারের ঘাটতি রাখার একটি বড় প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। 

কৃষকদের একটি সাধারণ ধারণা রয়েছে যে, বেশি সার দিলেই বেশি ফলন হবে। বিশেষ করে ইউরিয়া ও ফসফরাস জাতীয় সার জমিতে দ্রুত দৃশ্যমান পরিবর্তন আনে বলে কৃষকরা এগুলো প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি ব্যবহার করেন। বিপরীতে, সালফারের মতো অতি প্রয়োজনীয় অণুখাদ্যের ব্যবহারকে তারা অবহেলা করছেন। 

মাটির দীর্ঘমেয়াদী উর্বরতা হ্রাস 

মাটি একটি জীবন্ত উপাদান। এর নিজস্ব একটি খাদ্যচক্র ও স্বাস্থ্য রয়েছে। সুষম সার না পেয়ে বছরের পর বছর অতিরিক্ত রাসায়নিক ও অসম সার ব্যবহারের ফলে মাটির প্রাকৃতিক গুণাগুণ নষ্ট হচ্ছে। অতিরিক্ত ফসফরাস ব্যবহারের ফলে মাটিতে অন্যান্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান উদ্ভিদের গ্রহণ করার ক্ষমতা কমে যায়। আবার সালফারের ঘাটতির কারণে ফসলের গুণগত মান ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পায়। ফলে মাটি ধীরে ধীরে তার স্বাভাবিক উৎপাদন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে, যা দীর্ঘমেয়াদে মাটিকে বন্ধ্যাত্বের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। 

খাদ্য নিরাপত্তায় বড় ঝুঁকি 

৯৫ শতাংশ কৃষকের এই ভুল পদ্ধতির চাষাবাদ সরাসরি দেশের খাদ্য নিরাপত্তার ওপর আঘাত হানছে। সাময়িকভাবে হয়তো রাসায়নিক সারের জোরে কিছুটা বেশি ফলন মিলছে, কিন্তু মাটির উর্বরতা এভাবে কমতে থাকলে আগামী কয়েক দশকে ফসলের উৎপাদন ধস নামতে পারে। তাছাড়া, মাটির পুষ্টির ভারসাম্যহীনতার কারণে উৎপাদিত ফসলের পুষ্টিমানও কমে যাচ্ছে। ফলে জেনেশুনেই আমরা এক নীরব পুষ্টিহীনতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, যা জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় হুমকি। 

উত্তরণের উপায় ও করণীয়

এই বিপর্যয় থেকে বাঁচতে হলে এখনই রাষ্ট্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে:

১. কৃষক পর্যায়ে ব্যাপক সচেতনতা: মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সুষম সারের গুরুত্ব কৃষকদের বোঝাতে হবে। মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তাদের (উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা) মাধ্যমে উঠান বৈঠক ও প্রশিক্ষণের আয়োজন করতে হবে।
২. সহজ উপায়ে মাটি পরীক্ষা: দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে মাটি পরীক্ষার সুবিধা বাড়াতে হবে, যাতে কৃষকরা তাদের জমির মাটির প্রকৃত পুষ্টি চাহিদা জেনে সেই অনুযায়ী নির্দিষ্ট পরিমাণ সার ব্যবহার করতে পারেন।
৩. ডিজিটাল কৃষি সেবার বিস্তার: মোবাইল অ্যাপস বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কোন ফসলে কী পরিমাণ সার লাগবে, তা সহজে কৃষকদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।
৪. জৈব সারের ব্যবহারে উৎসাহ প্রদান: রাসায়নিক সারের ওপর চাপ কমাতে কম্পোস্ট, কেঁচো সার (ভার্মিকম্পোস্ট) ও সবুজ সার ব্যবহারের হার বাড়াতে হবে। 

উপসংহার

জমির মাটি বাঁচলে তবেই বাঁচবে দেশের কৃষি এবং নিশ্চিত হবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের খাদ্য নিরাপত্তা। ৯৫ শতাংশ কৃষকের সুষম সার ব্যবহার না করার এই পরিসংখ্যানটি কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি আমাদের কৃষিখাতের জন্য একটি লাল সংকেত। টেকসই ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের লক্ষ্যে অবিলম্বে সারের এই অসম মিশ্রণ ব্যবহার বন্ধ করে কৃষকদের শতভাগ সুষম সার ব্যবহারে অভ্যস্ত করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। 




দৈনিক জনকথা

সম্পাদক ও প্রকাশক: ওয়াদুদ খন্দকার
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক জনকথা
মাটির স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা: সারের ভারসাম্যহীন ব্যবহারে বাড়ছে ঝুঁকি ওয়াদুদ খন্দকার, দৈনিক জনকথা
0:00 0:00
1.0x