যুদ্ধবিরতি ভেঙে আবারও উত্তপ্ত মধ্যপ্রাচ্য: ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলা, চরম ঝুঁকিতে শান্তি চুক্তি
আন্তর্জাতিক ডেস্ক || মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ আবারও যুদ্ধবিমানের গর্জনে কেঁপে উঠেছে। গত ১৯ জুনের শান্তি সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষর হওয়ার মাত্র কয়েকদিনের মাথায়, টানা দ্বিতীয় দিনের মতো ইরানের ওপর বড় ধরনের সামরিক বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজে ড্রোনের মাধ্যমে আঘাত হানার জের ধরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি নির্দেশে এই প্রতিশোধমূলক হামলা চালানো হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে মার্কিন প্রশাসন। এই ঘটনার পর পাল্টা জবাবে ইরানও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে, যা পুরো অঞ্চলকে আবার পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
হামলার প্রেক্ষাপট ও মূল কারণ
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম ইরান যুদ্ধটি একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে কিছুটা শান্ত হয়েছিল。 তবে গত বৃহস্পতিবার থেকে পরিস্থিতির নাটকীয় অবনতি ঘটে।
- বাণিজ্যিক জাহাজে ড্রোন হামলা: মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) জানায়, হরমুজ প্রণালি দিয়ে দুই মিলিয়ন ব্যারেলের বেশি অপরিশোধিত তেল নিয়ে যাওয়ার সময় পানামার পতাকাবাহী ‘এম/টি কিকু’ (M/T Kiku) এবং সিঙ্গাপুরের ‘এভার লাভলি’ (M/V Ever Lovely) নামক বাণিজ্যিক জাহাজে ওয়ান-ওয়ে ড্রোন হামলা চালায় ইরান।
- যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ: ওয়াশিংটনের দাবি, ইরান এই হামলার মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে সরাসরি লঙ্ঘন করেছে। ইরানকে শান্তি বজায় রাখার সুযোগ দেওয়া হলেও তারা আগ্রাসনের পথ বেছে নিয়েছে।
- ইরানের অবস্থান: তেহরান অবশ্য জাহাজে হামলার দায় সরাসরি স্বীকার করেনি। তবে তারা দীর্ঘ দিন ধরেই দাবি করে আসছে যে, তাদের অনুমতি ছাড়া নির্ধারিত নৌপথের বাইরে চলাচলকারী কোনো জাহাজের নিরাপত্তা তারা দেবে না।
মার্কিন বিমান হামলার লক্ষ্যবস্তু
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (CENTCOM) অফিশিয়াল বিবৃতি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমানগুলো মূলত ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূল এবং হরমুজ প্রণালির কৌশলগত সামরিক অবকাঠামোগুলোকে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। হামলার প্রধান লক্ষ্যবস্তুগুলো ছিল:
১. ইরানের সামরিক নজরদারি অবকাঠামো এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা।
২. উপকূলীয় রাডার স্টেশন ও আকাশ প্রতিরক্ষা স্থাপনা।
৩. ড্রোন সংরক্ষণাগার ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাঁটি।
৪. সমুদ্রে মাইন পাতার বিশেষ সামরিক সক্ষমতা।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম নিশ্চিত করেছে যে, দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের সিরিক বন্দরের কাছে তাহরুই গ্রাম এবং ঐতিহাসিক কেশম দ্বীপে বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে。
ট্রাম্পের কঠোর হুঁশিয়ারি: "ইরানের অস্তিত্ব থাকবে না"
হামলা পরিচালনার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ অত্যন্ত আক্রমণাত্মক এক বার্তা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে বলেন, "এমন সময় আসতে পারে যখন আমাদের আর সংযত থাকার সুযোগ থাকবে না। তখন আমরা যে সামরিক অভিযান সফলভাবে শুরু করেছি, সেটি সম্পূর্ণ করতে বাধ্য হব। আর যদি এমনটা ঘটে, তবে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের আর কোনো অস্তিত্ব থাকবে না।"
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও সামাজিক মাধ্যমে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যেকোনো ধরনের সহিংসতার জবাব সমান সহিংসতার মাধ্যমেই দেওয়া হবে।
ইরানের পাল্টা আঘাত ও আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া
মার্কিন বিমান হামলার জবাবে ইরানের ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) বসে থাকেনি। তারা এক বিবৃতিতে জানায়, "চুক্তিভঙ্গকারী" মার্কিন বাহিনীকে উপযুক্ত শিক্ষা দিতে তারা মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে পাল্টা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
- কুয়েত ও বাহরাইনে হামলা: বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন পঞ্চম নৌবহর (Fifth Fleet) এবং কুয়েতের আল-সালাম সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইরান। কুয়েতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বেশ কিছু ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে এবং বাহরাইনে নাগরিকদের নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার জন্য সাইরেন বাজানো হয়েছে।
- ওমানের সামুদ্রিক করিডোর: বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের আশঙ্কায় ওমান জরুরি ভিত্তিতে হরমুজ প্রণালিতে একটি সম্পূর্ণ ফ্রি 'অস্থায়ী সামুদ্রিক করিডোর' চালুর ঘোষণা দিয়েছে, যাতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সচল রাখা যায়।
সংকটের ভবিষ্যৎ: বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা?
বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয় এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে। ফলে এই অঞ্চলে যুদ্ধ পরিস্থিতির নতুন মোড় বিশ্বজুড়ে তেলের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প এবং ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের মধ্যকার সাম্প্রতিক শান্তি চুক্তিটি এখন পুরোপুরি ভেস্তে যাওয়ার মুখে। যদি দুই পক্ষই কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলে ফিরে না আসে, তবে এই ছায়াযুদ্ধ বিশ্বের জন্য এক ভয়াবহ মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনবে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা, বিবিসি নিউজ, সিএনএন লাইভ এবং রয়টার্স ইন্টারন্যাশনাল।