মাটির নিচে মোগল ইতিহাসের খনি: অবহেলিত গাজীপুরের লোহাদী গ্রাম ওয়াদুদ খন্দকার, দৈনিক জনকথা
মাটির নিচে মোগল ইতিহাসের খনি: অবহেলিত গাজীপুরের লোহাদী গ্রাম ওয়াদুদ খন্দকার, দৈনিক জনকথা গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার একটি সাধারণ গ্রাম লোহাদী। কিন্তু এই সাধারণ নামের আড়ালেই লুকিয়ে আছে এক হাজার বছরের প্রাচীন রোমাঞ্চকর ইতিহাস। লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা এই গ্রামটির মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে মোগল আমলের এক বিশাল কর্মযজ্ঞের ইতিহাস, যা আজো প্রত্নতাত্ত্বিকদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য অপেক্ষা করছে।স্থানীয় প্রবীণদের মুখে মুখে এবং ঐতিহাসিকভাবে প্রচলিত আছে যে, এই লোহাদী গ্রামের মাটির নিচেই লুকিয়ে আছে বিশাল লোহার খনি। 'লোহাদী' নামের উৎপত্তিও হয়েছে এই লোহা বা লৌহ শব্দ থেকে। বলা হয়ে থাকে, মোগল আমলে এই গ্রামের মাটি থেকে লোহা আহরণ করা হতো। শুধু তাই নয়, এখানকার লোহা দিয়ে তৈরি হতো মোগল সামাজ্যের বীর যোদ্ধাদের তরবারি, ঢাল ও যুদ্ধের নানা মারণাস্ত্র। এখনো এই গ্রামের বিভিন্ন স্থানে মাটির গভীরে, এমনকি পুকুর বা ডোবা খনন করতে গেলে কালচে রঙের ভারী লোহার আকরিক বা 'লোহার কিট' ভেসে ওঠে। শত শত বছর পার হয়ে গেলেও সেই ইতিহাসের সাক্ষী আজো সেখানে দৃশ্যমান।লোহাদী গ্রামের এই গল্প শুধু কোনো রূপকথা নয়, বরং এটি আমাদের সমৃদ্ধ প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের এক জীবন্ত প্রমাণ। অথচ অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, সরকারি বা বেসরকারিভাবে এখানে বড় কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান এখনো চালানো হয়নি।শুধু লোহাদী গ্রামই নয়, পুরো গাজীপুর জেলাই যেন ইতিহাসের এক রত্নভাণ্ডার। ভাওয়াল রাজবাড়ী, ঐতিহাসিক টোক সুলতানি মসজিদ, কিংবা বিভিন্ন প্রাচীন দীঘি ও মঠ প্রমাণ করে যে—এখানে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের জন্য এখনো অনেক কিছুই বাকি রয়ে গেছে। সঠিক খননকার্য এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণা চালানো হলে হয়তো উন্মোচিত হতে পারে বাংলার মোগল আমল বা তারও আগের কোনো অজানা অধ্যায়।লোহাদী গ্রামের এই ঐতিহাসিক লোহা তৈরির উৎস এবং প্রাচীন ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে জরুরি সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন। মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা এই ইতিহাসকে অবহেলায় হারিয়ে যেতে দেওয়া যায় না। যথাযথ প্রত্নতাত্ত্বিক খনন ও সংরক্ষণের মাধ্যমে লোহাদীকে একটি ঐতিহাসিক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। আমাদের গৌরবময় অতীতকে উন্মোচন করতে কাপাসিয়ার লোহাদী গ্রামে দ্রুত রাষ্ট্রীয় খননকাজ শুরু হবে—এটাই এখন সময়ের দাবি।