মিতব্যয়িতার নতুন নজির: রাষ্ট্রীয় পরিমিতিবোধ ও আস্থার অর্থনীতি
মিতব্যয়িতার নতুন নজির: রাষ্ট্রীয় পরিমিতিবোধ ও আস্থার অর্থনীতিওয়াদুদ খন্দকার বিগত কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে এক ধরনের জাঁকজমক ও বিলাসী জীবনের প্রদর্শন সাধারণ মানুষের মনে গভীর ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদের কর্তাব্যক্তিদের ব্যক্তিগত ও দাপ্তরিক খরচের খতিয়ান যখন গণমাধ্যমে প্রকাশ পেত, তখন সাধারণ করদাতারা নিজেদের চরমভাবে বঞ্চিত মনে করতেন। তবে সম্প্রতি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কৃতির সেই খোলনলচে বদলে যাওয়ার এক অভূতপূর্ব নজির দেখা যাচ্ছে। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের একটি সাম্প্রতিক বক্তব্য দেশের আপামর জনসাধারণের মনে নতুন করে আশার আলো সঞ্চার করেছে। বাণিজ্যমন্ত্রীর দেওয়া তথ্যমতে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের দুপুরের খাবারের সরকারি বাজেট মাত্র ১০০ টাকা, যা দেশের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক ফোরাম ক্যাবিনেটের সবার জন্যই সমভাবে নির্ধারিত। আপাতদৃষ্টিতে এটি কেবল একটি লাঞ্চ মেন্যুর বাজেট মনে হলেও, এর গভীরে লুকিয়ে আছে রাষ্ট্রীয় অপচয় রোধ, চরম মিতব্যয়িতা এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার এক বিশাল রাজনৈতিক বার্তা। অপচয়ের সংস্কৃতি থেকে ইতিবাচক প্রত্যাবর্তনআমাদের দেশে অতীতে একেকজন প্রধানমন্ত্রীর দুপুরের খাবারের বিল বাবদ বিপুল অঙ্কের অর্থ সরকারি কোষাগার থেকে ব্যয়ের নজির রয়েছে। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে বর্তমান সরকার প্রধান এবং তাঁর মন্ত্রিসভা যে পদক্ষেপ নিয়েছেন, তা এক ঐতিহাসিক সংস্কারের ইঙ্গিত দেয়। যেখানে দেশের সাধারণ নাগরিক দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে পরিমিত জীবনযাপন করছেন, সেখানে রাষ্ট্রের চালিকাশক্তিরা নিজেদের ভোগবিলাস বিসর্জন দিয়ে মাত্র ১০০ টাকার দুপুরের খাবারের মধ্য দিয়ে কর্মদিবস অতিবাহিত করছেন। এই সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে, সরকার কেবল মুখে সংস্কার কিংবা সাধুতার কথা বলছে না, বরং তা নিজের ঘর থেকে শুরু করেছে। সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে ত্যাগ ও সংযমের বার্তানেতৃত্বের বড় গুণ হলো ‘লিডিং বাই এক্সাম্পল’ বা নিজে উদাহরণ তৈরি করে অনুসারীদের পথ দেখানো। বর্তমান সরকারের এই পরিমিতিবোধ ঠিক সেই কাজটিই করেছে। যখন একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর মন্ত্রীরা প্রতীকীভাবে হলেও ত্যাগের এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন, তখন তা পুরো আমলাতন্ত্র এবং প্রশাসনের তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত একটি কড়া বার্তা পৌঁছায়। এটি স্পষ্ট করে দেয় যে, জনগণের ট্যাক্সের টাকার প্রতিটি আনা-পয়সার হিসাব অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে রাখা হচ্ছে। অপচয় রোধের এই সংস্কৃতি যদি সরকারি খাতের অন্যান্য স্তরেও কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে বার্ষিক বাজেটের একটি বিশাল সাশ্রয় দেশের বড় বড় উন্নয়নমূলক কাজে ব্যবহার করা সম্ভব হবে।জনমনে আস্থা বৃদ্ধির এক নতুন সোপানএকটি কল্যাণকামী রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হলো সরকারের প্রতি জনগণের অবিচল আস্থা। দীর্ঘদিনের দুঃশাসন, দুর্নীতি ও ভিআইপি সংস্কৃতির কারণে সাধারণ মানুষের মনে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্তরের প্রতি যে অনাস্থা ও দূরত্বের তৈরি হয়েছিল, তা ঘোচাতে এই ধরনের আত্মত্যাগ অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করবে। একজন রিকশাচালক, পোশাক শ্রমিক কিংবা মধ্যবিত্ত চাকরিজীবী যখন জানতে পারেন যে, তাঁর দেশের প্রধানমন্ত্রীও তাঁর মতোই সাধারণ খাবারে লাঞ্চ সম্পন্ন করছেন, তখন সরকারের প্রতিটি নীতি ও সিদ্ধান্তের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধাবোধ ও স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন বহুগুণ বেড়ে যায়। এই ধরনের মানবিক ও সংযমী পদক্ষেপ শাসক ও শাসিতের মধ্যকার দূরত্ব ঘুচিয়ে দেয়। শেষ কথাবাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের এই বক্তব্য যদি মাঠপর্যায়ের প্রতিটি স্তরে সত্য হিসেবে প্রতিফলিত হয়, তবে তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা করবে। ১০০ টাকার এই বাজেট কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক সততা, পরিমিতিবোধ ও জবাবদিহিতার এক শক্তিশালী দলিল। আমরা আশা করব, সর্বোচ্চ পর্যায়ের এই ত্যাগের মানসিকতা ও সংযমের শিক্ষা শুধু খাবারের টেবিলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং রাষ্ট্রীয় কেনাকাটা, বিদেশ ভ্রমণ এবং বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণেও সমানভাবে প্রতিফলিত হবে। তবেই জনমনে সরকারের প্রতি আস্থা টেকসই হবে এবং আমরা একটি সত্যিকারের বৈষম্যহীন ও মিতব্যয়ী সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব। লেখক: কলামিস্ট, দৈনিক জনকথা।