ঢাকা    বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬, ১০ আষাঢ় ১৪৩৩
দৈনিক জনকথা

ঢাকার কাছেই বারবার ভূমিকম্পের উৎপত্তি: বাড়ছে কি মহাবিপর্যয়ের আশঙ্কা? - বিশেষ প্রতিবেদক, দৈনিক জনকথা ঢাকা, ২৪ জুন ২০২৬

ঢাকার কাছেই বারবার ভূমিকম্পের উৎপত্তি: বাড়ছে কি মহাবিপর্যয়ের আশঙ্কা? - বিশেষ প্রতিবেদক, দৈনিক জনকথাঢাকা, ২৪ জুন ২০২৬গত ২২ জুন সোমবার রাতের ঠিক ৯টা ২৮ মিনিট। হঠাৎ এক তীব্র ঝাঁকুনিতে কেঁপে উঠল মেগাসিটি ঢাকা। আতঙ্কিত মানুষ বহুতল ভবন ছেড়ে রাস্তায় নেমে এলেন। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানাল, রিখটার স্কেলে এই কম্পনের মাত্রা ছিল ৪.৪ এবং এর কেন্দ্রস্থল ছিল ঢাকা থেকে মাত্র ১৬ কিলোমিটার পূর্বে, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে। মাত্রা খুব বেশি না হলেও উৎপত্তিস্থল ঢাকার এতো কাছে হওয়ায় ঝাঁকুনি অনুভূত হয়েছে বেশ জোরালোভাবে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গত ২০২৫ সালের ২১ নভেম্বর নরসিংদীর মাধবদীতে আঘাত হেনেছিল ৫.৭ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প, যা ছিল গত কয়েক দশকে দেশের অভ্যন্তরে উৎপন্ন হওয়া অন্যতম তীব্র কম্পন। এরপর বাড্ডা, রূপগঞ্জ, পলাশ ও রূপগঞ্জের চ্যুতি বা ফল্টলাইনগুলো থেকে একের পর এক মৃদু কম্পন তৈরি হচ্ছে। ঢাকার ঠিক দোরগোড়ায় এভাবে বারবার ভূমিকম্পের কেন্দ্রবিন্দু বা এপিসেন্টার তৈরি হওয়া এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ। প্রশ্ন উঠেছে—প্রকৃতি কি আমাদের কোনো বড় বিপদের বার্তা দিচ্ছে? এগুলো কি শুধুই সাধারণ টেকটোনিক প্রক্রিয়া, নাকি কোনো মহাবিপর্যয়ের পূর্বাভাস? ভূতাত্ত্বিক অবস্থান ও ফল্টলাইনের ফাঁদবাংলাদেশ মূলত তিনটি গতিশীল টেকটোনিক প্লেটের (ইন্ডিয়ান, ইউরেশিয়ান এবং বার্মিজ প্লেট) সংযোগস্থলে অবস্থিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের গবেষক ও ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকা শহরের ঠিক নিচে সরাসরি কোনো সক্রিয় ফল্টলাইন না থাকলেও চারপাশের চ্যুতি বা ফল্টলাইনগুলো অত্যন্ত বিপজ্জনক। মধুপুর চ্যুতি (Madhupur Fault): ঢাকার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত এই ফল্টলাইনটি ৭ থেকে ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্প ঘটাতে সক্ষম। ১৮৮৫ সালে এখানে সাত মাত্রারও বেশি শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়েছিল। ডাউকি চ্যুতি (Dawki Fault): সিলেটের উত্তর সীমান্তে অবস্থিত এই চ্যুতিতে ১৮৯৭ সালে ৮.১ মাত্রার প্রলয়ঙ্কারী ‘গ্রেট ইন্ডিয়ান আর্থকোয়েক’ হয়েছিল। নরসিংদী-রূপগঞ্জ জোন (ব্লাইন্ড ফল্ট): সাম্প্রতিক সময়ে এই অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ চ্যুতিগুলো ভীষণ সক্রিয় হয়ে উঠেছে, যা মাটির নিচে দীর্ঘকাল ধরে জমে থাকা শক্তি বা ‘স্ট্রেস’ মুক্তির প্রক্রিয়াকে নির্দেশ করে।বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় কোনো ভূমিকম্পের আগে এই ধরনের ছোট ছোট কম্পন বা 'ফোরশক' (Foreshock) দেখা যায়। শত বছরেরও বেশি সময় ধরে এই অঞ্চলের প্রধান ফল্টলাইনগুলোতে বড় কোনো শক্তি মুক্ত না হওয়ায় একটি রিখটার স্কেলে ৭ থেকে ৮ মাত্রার ভূমিকম্প এখানে যেকোনো সময় ‘ওভারডিউ’ বা অবধারিত হয়ে পড়েছে। ঢাকার নরম মাটি ও ‘সাইট অ্যামপ্লিফিকেশন’ঢাকার ভৌগোলিক গঠন এই ঝুঁকিকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ঢাকা শহর গড়ে উঠেছে মূলত পলিমাটি এবং ভরাট করা জলাভূমির ওপর। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ (USGS) এবং স্থানীয় বিশেষজ্ঞদের মতে, যখন কোনো দূরবর্তী বা নিকটবর্তী ফল্ট থেকে ভূমিকম্পের তরঙ্গ ঢাকার এই নরম ও আর্দ্র মাটিতে প্রবেশ করে, তখন তরঙ্গের গতি কমে যায় কিন্তু ঝাঁকুনির তীব্রতা বহুগুণ বেড়ে যায়। একে বৈজ্ঞানিক ভাষায় বলা হয় 'সাইট অ্যামপ্লিফিকেশন' (Site Amplification)। এর ফলে মাঝারি মাত্রার কোনো কম্পনও ঢাকার বহুতল ভবনগুলোতে মারাত্মক দুলুনি ও কাঠামোগত বিপর্যয় ঘটাতে পারে। এছাড়া ভূগর্ভস্থ পানি অতিরিক্ত উত্তোলনের ফলে মাটির স্থায়িত্ব কমে যাচ্ছে, যা ভূমিকম্পের সময় মাটিকে তরল পদার্থের মতো আচরণ করতে বাধ্য করে (Liquefaction)। ৭.৫ মাত্রায় কতটা প্রস্তুত ঢাকা?বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এবং রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) বিভিন্ন সমীক্ষায় যে চিত্র উঠে এসেছে, তা অত্যন্ত ভয়াবহ: ভবন ধসের আশঙ্কা: মধুপুর ফল্টলাইনে যদি ৬.৯ থেকে ৭.৫ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হানে, তবে ঢাকার প্রায় ৮ থেকে ১০ লাখ ভবন তাৎক্ষণিকভাবে ধসে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। ঢাকার বিপুল সংখ্যক ভবন নির্মাণ কোড (BNBC) না মেনে এবং নকশা পরিবর্তন করে তৈরি করা হয়েছে। সরু রাস্তা ও উদ্ধারকাজের সীমাবদ্ধতা: ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার প্রায় ৭৬ শতাংশ রাস্তাই অত্যন্ত সরু। বড় দুর্যোগে এই সরু গলিপথগুলোতে উদ্ধারকারী ভারী যানবাহন বা ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি প্রবেশ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। গ্যাস-বিদ্যুতের দ্বিতীয় দুর্যোগ: ভূমিকম্পের পরপরই গ্যাস লাইন বিস্ফোরণ এবং বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে পুরো শহরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সরকারি উদ্যোগ ও বর্তমান প্রস্তুতিঝুঁকি মোকাবিলায় সরকার সম্প্রতি কিছু দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনে (দক্ষিণে ২৫৬টি এবং উত্তরে ১৮৯টি) মোট ৪৪৫টি ভূমিকম্প-সহনশীল আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে এবং অনুমোদনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি জরুরি উদ্ধারকাজ পরিচালনার জন্য প্রায় ১ লাখ স্বেচ্ছাসেবকের একটি সমন্বিত ডাটাবেজ তৈরি করা হচ্ছে। রাজউকও তার 'আর্বান রেজিলিয়েন্স প্রজেক্ট'-এর আওতায় সরকারি ভবন, স্কুল ও হাসপাতালগুলোর ভূমিকম্প সহনশীলতা পরীক্ষা করছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রস্তুতি প্রয়োজনের তুলনায় ২০ শতাংশেরও কম। শুধু আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করলেই হবে না, বরং বিদ্যমান ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোকে রেট্রোফিটিং (কাঠামো শক্তিশালীকরণ) করা এবং নতুন ভবন নির্মাণে কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করা জরুরি। শেষ কথাপ্রকৃতি আমাদের বারবার মৃদু ঝাঁকুনি দিয়ে সতর্ক করছে। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ কিংবা নরসিংদীর মাধবদীর সাম্প্রতিক উৎপত্তিস্থলগুলো ঢাকার নাগরিকদের জন্য এক চূড়ান্ত ওজর বা ওয়েক-আপ কল। ভূমিকম্পকে ঠেকানো সম্ভব নয়, কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা, ভবনের গুণগত মান নিশ্চিতকরণ এবং গণসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব। দৈনিক জনকথার মাধ্যমে আমরা নীতিনির্ধারক ও সাধারণ নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানাই—আর উদাসীনতা নয়, মহাবিপর্যয় আসার আগেই ঢাকাকে সুরক্ষিত করার এখনই শেষ সময়। 

ঢাকার কাছেই বারবার ভূমিকম্পের উৎপত্তি: বাড়ছে কি মহাবিপর্যয়ের আশঙ্কা?   - বিশেষ প্রতিবেদক, দৈনিক জনকথা ঢাকা, ২৪ জুন ২০২৬