ঢাকা    বুধবার, ১০ জুন ২০২৬, ২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
দৈনিক জনকথা

হায়রে ঈদ! লাশের মিছিলে যখন স্তব্ধ মানবতা - ওয়াদুদ খন্দকার দৈনিক জনকতা

হায়রে ঈদ! লাশের মিছিলে যখন স্তব্ধ মানবতা- ওয়াদুদ খন্দকার দৈনিক জনকতাএকটি উৎসবের রাত। আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরই আনন্দের আলো নিয়ে হাজির হতো পবিত্র ঈদ। সবাই যখন ঘরে ফেরার তাগিদে ব্যস্ত, নতুন জামা আর সেমাইয়ের সুবাসে যখন মায়েরা অপেক্ষা করছেন—ঠিক তখনই এক নিমেষে নিভে গেল একটি পুরো পরিবারের আশার প্রদীপ। যে ঈদ নিয়ে কত শত পরিকল্পনা ছিল, সেই ঈদ আসার আগেই সড়ক কেড়ে নিল সবকিছু। নিমিষেই শেষ হয়ে গেল একটি পুরো সুন্দর পরিবার।দুর্ঘটনার পর চারপাশের দৃশ্যটি ছিল নরককুণ্ডের মতো। একদিকে নিথর হয়ে পড়ে আছে প্রিয়তমা স্ত্রীর দেহ। অন্য হাতে শক্ত করে ধরে রাখা আদরের ছোট্ট কন্যাসন্তানটি। বুকের ভেতর যে তীব্র হাহাকার আর শূন্যতা, তা হয়তো পৃথিবীর কোনো ভাষা দিয়ে বোঝানো সম্ভব নয়। পাথর হয়ে যাওয়া সেই স্বামী যখন নিজের স্ত্রীর লাশ কাঁধে তুলে নিয়ে উপস্থিত শত শত মানুষের ভিড়ে আকুতি করছিলেন—"ভাই, দয়া করে আমার বাচ্চার লাশটা একটু আমার বুকে তুলে দেন...", তখন যেন আকাশ-বাতাসও ভারী হয়ে উঠছিল।কিন্তু সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি কিংবা কষ্টের জায়গাটি কেবল সড়ক দুর্ঘটনা ছিল না; আসল ট্র্যাজেডি ছিল সেখানে উপস্থিত মানুষের নির্মম নীরবতা। যে লোকটা চোখের সামনে নিজের সবকিছু হারিয়ে একা দাঁড়িয়ে হাহাকার করছিলেন, তাকে সাহায্য করার জন্য ওই বিশাল জনসমুদ্রের একজন মানুষও এগিয়ে আসেনি। শত শত মানুষ স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল, কেউ হয়তো পকেট থেকে মোবাইল বের করে ছবি বা ভিডিও ধারণ করতে ব্যস্ত ছিল। কিন্তু একটা রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে যে একটুখানি মানবিকতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া দরকার—সেই বোধটুকু যেন আমাদের সমাজ থেকে পুরোপুরি হারিয়ে গেছে।আমরা কেমন মানুষ? কেমন সমাজ গড়ে তুলছি আমরা? বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এই যুগে আমাদের হাতের মুঠোয় পৃথিবী চলে এসেছে ঠিকই, কিন্তু বুক থেকে হারিয়ে গেছে দয়া, মায়া আর ন্যূনতম সহানুভূতি। একজন বাবা তার সন্তানের লাশ বুকে নেওয়ার জন্য মানুষের দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা চাচ্ছেন, আর আমরা দর্শক সেজে সেই দৃশ্য উপভোগ করছি—এর চেয়ে বড় সামাজিক পতন আর কী হতে পারে?প্রতিটি ঈদের আগে আমাদের সড়কগুলো মৃত্যুর ফাঁদে পরিণত হয়। বেপরোয়া গতি, ফিটনেসবিহীন গাড়ি আর খামখেয়ালিপনা প্রতি বছর অসংখ্য মায়ের কোল খালি করে, হাজারো পরিবারকে ধ্বংস করে দেয়। কিন্তু আইন আর সচেতনতার এই ঘাটতির চেয়েও বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে আমাদের হৃদয়ে। আজ যদি বিপদে পড়া মানুষটির পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা আমাদের না থাকে, তবে কাল আপনার বা আমার বিপদেও কেউ এগিয়ে আসবে না।এই ঈদ সেই ভাগ্যহত বাবার কাছে কোনো আনন্দ নিয়ে আসেনি, নিয়ে এসেছে সারাজীবনের এক জীবন্ত যন্ত্রণা। আসুন, শুধু ছবি বা ভিডিও শেয়ার করে দায়িত্ব শেষ না করি। সড়কে নিয়ম মেনে চলার পাশাপাশি নিজের ভেতরের মরে যাওয়া মানুষটিকে আবার জাগিয়ে তুলি। অন্তত কোনো বিপন্ন মানুষের আর্তনাদে যেন আমাদের হাত দুটো পকেটে না থেকে, সাহায্যের জন্য প্রসারিত হয়।মানবতা আর বিবেকের জয় হোক, এমন নির্মম ঈদ আর কোনো পরিবারে যেন না আসে।

হায়রে ঈদ! লাশের মিছিলে যখন স্তব্ধ মানবতা  - ওয়াদুদ খন্দকার দৈনিক জনকতা