অপরাধের খুঁটিতে বাঁধা বাবা, মানবতার অনন্য পাঠ দিল ৯ বছরের শিশুকন্যা
ওয়াদুদ খন্দকার, দৈনিক জনকথা:
বরিশাল: সমাজের চোখ যখন অন্ধ আক্রোশে মত্ত, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার মধ্যযুগীয় উল্লাসে যখন চারপাশ মুখরিত, ঠিক তখনই এক অবুঝ শিশু দেখাল ভালোবাসার শক্তি কাকে বলে। প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার সহ বিভিন্ন মূলধারার গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বরিশালের উজিরপুর উপজেলার বামরাইল বাজারে চুরির অভিযোগে খুঁটিতে বেঁধে রাখা এক অসহায় বাবার মুখে পরম মমতায় খাবার তুলে দিয়ে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে তাঁর ৯ বছর বয়সী শিশুকন্যা। ঘটনাটি দেশের প্রতিটি বিবেকবান মানুষকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে।ঘটনার প্রেক্ষাপট ও নির্মমতাস্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত শুক্রবার গভীর রাতে বামরাইল বাজারের একটি মুদিদোকানে চুরির চেষ্টার অভিযোগে অনিক সরদার নামের এক যুবককে আটক করে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। অভিযোগের সত্যতা যাচাই বা আইনি প্রক্রিয়ার তোয়াক্কা না করে একদল মানুষ তাকে বেদম মারধর করে বাজারের একটি বিদ্যুতের খুঁটির সঙ্গে শক্ত করে বেঁধে রাখে। সারারাত অনাহারে ও নির্যাতনে নিস্তেজ হয়ে ওই ব্যক্তি খুঁটির সঙ্গেই ঝুলে ছিলেন。শত ভিড় ঠেলে কন্যার মমতার আগমনশনিবার সকালে বাবার এই চরম দুর্দশার খবর পেয়ে ছুটে আসে তাঁর ৯ বছরের শিশুসন্তান। চারপাশে তখন উৎসুক মানুষের উপচে পড়া ভিড়, অবজ্ঞা আর ধিক্কারের গুঞ্জন। কিন্তু এক বুক আতঙ্ক আর বাবার প্রতি অপরিসীম ভালোবাসা নিয়ে সেই ভিড় ঠেলে সামনে এগিয়ে যায় অবুঝ মেয়েটি। সারারাত অভুক্ত ও নিস্তেজ বাবার জন্য নিজের জমানো বা জোগাড় করা সামান্য টাকা দিয়ে পাশের দোকান থেকে এক কাপ চা আর রুটি কিনে আনে সে।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এক হৃদয়স্পর্শী ভিডিওচিত্রে দেখা যায়, চুরির অভিযোগে সমাজ যাকে ‘চোর’ আখ্যা দিয়ে হাত-পা বেঁধে রেখেছে, তার সমস্ত অপরাধ ভুলে সেই ৯ বছরের শিশুকন্যা পরম মমতায় চায়ে ভেজানো রুটি বাবার মুখে তুলে দিচ্ছে। শুধু তাই নয়, বাবার শরীরে হাত বুলিয়ে সে জানতে চাচ্ছিল, ‘বাবা তুমি বেশি কষ্ট পাচ্ছো?’ একই সঙ্গে উপস্থিত লোকজনের কাছে সে কেঁদে কেঁদে অনুরোধ করছিল, তার বাবাকে যেন আর মারধর না করা হয়।আইন নিজের হাতে নেওয়ার সংস্কৃতি ও আমাদের বিবেকএই একটি দৃশ্য যেন উপস্থিত জনতা এবং পুরো সমাজকে এক বিরাট কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। অপরাধী যদি অন্যায় করে থাকে, তবে তাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য দেশের প্রচলিত আইন ও পুলিশ প্রশাসন রয়েছে। কিন্তু চুরির অপবাদ বা ছিঁচকে চুরির অভিযোগে কোনো মানুষকে সারারাত খুঁটিতে বেঁধে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন করার অধিকার সাধারণ মানুষকে কে দিয়েছে? কোনো ব্যক্তি অপরাধী হলেও তার মৌলিক মানবাধিকার এবং মানবিক মর্যাদা কেড়ে নেওয়া যায় না।কিন্তু আফসোস, বাজারে শত শত মানুষের উপস্থিতিতে এই বর্বরতা যখন চলছিল, তখন কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নিতে বাধা দেয়নি। অথচ একটি ৯ বছরের শিশুকন্যা তার নিষ্পাপ আচরণ দিয়ে উপস্থিত সবার ভেতরের ঘুমন্ত বিবেককে জাগিয়ে তুলল। মেয়ের এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা দেখে একপর্যায়ে উপস্থিত অনেকের চোখেই পানি চলে আসে এবং পরবর্তীতে মুচলেকা নিয়ে ওই ব্যক্তিকে ছেড়ে দেওয়া হয়।উপসংহারউজিরপুরের বামরাইল বাজারের এই ঘটনা শুধু একটি ছিঁচকে চুরির বা পারিবারিক আকুলতার গল্প নয়; এটি আমাদের বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও গণপিটুনির অভ্যাসের মুখে এক সজোরে চপেটাঘাত। সন্তানের কাছে বাবার সামাজিক পরিচয় যাই হোক না কেন, তার ভালোবাসা যে অবিচল—তা এই ৯ বছরের মেয়েটি প্রমাণ করেছে। তবে এই ঘটনার পর শিশুটি মানসিকভাবে চরম আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে বলে জানা গেছে। উজিরপুর উপজেলা প্রশাসন (ইউএনও) এবং পুলিশ ইতিমধ্যেই পরিবারটির খোঁজখবর নিয়েছে এবং অপরাধের পথ ছেড়ে দিলে সরকারি সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে।আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এই অন্ধ সংস্কৃতি থেকে আমরা কবে বের হব? একটি শিশুর কাছ থেকে পাওয়া এই মানবতার পাঠ কি আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রকে একটু সংবেদনশীল হতে শেখাবে না? প্রশ্নটি আজ প্রতিটি সচেতন নাগরিকের কাছে।